৬। খোঁজ ..........।।
দুপুরে বসেবসে
জোনাকি খুব একঘেয়ে বোধ করছিল । বর পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে । মেয়ে নিজের মত কম্পিউটারে
ফেসবুক করছে । এই সময় কেউই
তাকে পছন্দ করে না । রোজ দুপুরে সেও ঘন্টা খানেক ঘুমোয় । কিন্তু আজ ঘুম উধাও ।
কম্পিউটারের কি বোর্ডের শব্দে কিছুটা নিঃসঙ্গতা কাটে কিন্তু আর একটু পরে মেয়ে
টিউশন ক্লাশে চলে যাবে । তখন আর কোন শব্দই থাকবে না । একমাত্র ভরসা দূরে মাঠের
ওপারে সেই উঁচু চিমনিটা । কয়েকটা
বড় গাছ , আর কিছু না ।
সে মেয়েকে বলে , তোরা কি করে ফেসবুক করিস আমাকে শিখিয়ে দে তো ! আমি দেখব ।
- তোমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে নাকি ?
- হ্যাঁ । অশোক আঙ্কেলকে বলেছিলাম , অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছে ।
- বেশ । তোমার পাশওয়ার্ড
বল ।
- পাশওয়ার্ড ? ওসব জানি
না ।
- আঙ্কেলকে জিজ্ঞাসা করো । নাহলে খোলা যাবে না ।
সে ঘড়ি দেখল ।
দুপুর আড়াইটে । এইসময় ফোন করলে অশোক কি বিরক্ত হবে ? এখন কোথায় আছে তাও
জানা নেই । তবু সে ফোন করল
। বলা মাত্রই পাশওয়ার্ড বলে দিল অশোক । উলটে হাল্কা প্রশ্ন করল - অ্যাকাউন্ট তো
সেই কবে খোলা হয়েছে , এর মাঝে আর দেখেন নি নাকি ?
বেমালুম মিথ্যে
কথা বলে দেয় জোনাকি । - দেখেছি তো ! আসলে সবসময়
মনে রাখতে পারিনা । কি করব ? আপনাদের মত শুধু ডিউটি আর ফেসবুক করলেই তো হয়
না , আরো কত কিছু যে আছে ?
-
কি আছে ? ঘর সংসার ?
অশোকের আপনি
আজ্ঞে শুনে গা পিত্তি জ্বলে গেল জোনাকির । গত সপ্তাহেও তারা যতক্ষণ একসঙ্গে ছিল পরষ্পর পরষ্পরকে তুমি করেই কথা বলেছে ।
-
কেন আমার সেই পুরোন প্রেমিক বুঝি হারিয়ে গেছে? তিনিও তো আছেন । এই তো
কিছুক্ষণ আগেই কত কথা হল ।
থম্ মেরে গেল
অশোক । এই এক গল্প জোনাকির । পুরনো প্রেমিক । প্রেমিকের নাম ধাম জানা নেই অবশ্য । তবে জিজ্ঞাসা করতে ক্ষতি কি ?
অশোক তো আর ভোজালি হাতে ওদিকে দৌড়ে যাচ্ছে না ।
-
কি নাম ভদ্রলোকের ?
-
কেন ফোন করবেন ?
-
নাঃ । ফোনে কি বলব ?
বলব জোনাকি আপনার নাম্বারটা ভুলে গেছে তাই আমাকে জেনে নিতে বলল।
-
বললে খুশিই হবে । উনি আমাকে নিয়ে যথেষ্ট
হীনমন্যতায় ভোগেন ।
এই বাক্যটা ততটা
হজম হলনা অশোকের । এতটা জায়গা ? মনে হল এবার জোনাকিকে সে বলে ফোনটা রাখছি । কে
কোথায় কাকে খুঁজে মরছে সে জেনে তার কি লাভ ? কিন্তু রাস্তা সুগম করে দিল জোনাকি নিজেই । ওপাশ থেকে
বলল , শঙ্করও ফেসবুক করে । দেখি
আজ যদি ধরতে পারি একবার । রাখি হ্যাঁ ?
রেখে দিল জোনাকি
ফোনটা । মেয়ে এবার পড়তে যাবে । রেডি হচ্ছে সে । জোনাকি
বলল ছাতা নিয়েছিস ? খাবার জল দিয়ে দিল সঙ্গে । তারপর মেয়ে চলে গেলে দরজা বন্ধ করল
। চন্দন গভীর ঘুমোচ্ছে । ওর আজ আর জ্বর নেই ।
কপালে হাত দিল তবু । তারপর ঘরের দরজাটা হাল্কা ভেজিয়ে দিয়ে আবার এঘরে চলে এল ।
একটুক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল সে । সাড়ে তিনটে বাজে । ফেসবুক খোলা আছে । শঙ্করকে সে কি এখন একবার খুঁজে দেখবে ? এসময় অশোকের মুখটা তার হঠাৎ মনে পড়ল । হাসি
পেল । আবার ফেসবুক দেখল । তার নাম শঙ্কর নয় । তার অন্য একটা নাম ছিল । পদবীটা আজ
আর মনে নেই । হয়ে গেল তো অনেকগুলো বছর । ভাবতে ভাবতে ফেসবুক বন্ধ করে দিল জোনাকি। ওসব তার পোষায় না। লোক গিজগিজে বাজারে ঘুরে মরার মত । এর চেয়ে তার
দূরের চিমনিই ভাল । সেই গোলাপি নীল লাল ধোঁয়া । জানালা খুলে দূর চিমনির দিকে
তাকিয়ে রইল সে ।
অশোক অফিসে ছিল ।
নিজের ঘরে । জোনাকির সঙ্গে কথা বলা হয়ে গেলে হাতের কাজ বন্ধ রেখে সোজা ফেসবুক অন
করল সে । এটা তার নেশা নয় কিন্তু তার হাত যেন নিজের অজান্তেই ওদিকে চলে গেল । টাইপ করল নাম, করতেই বেশ কয়েকজন শঙ্কর পরপর বেরিয়ে এল ।
প্রথম জন শঙ্কর চ্যাটার্জী। কাজ করেন ইস্টার্ন রেলওয়েতে। পড়েছেন শ্রী গোপালচন্দ্র কলেজে । থাকেন নিত্যানন্দপুর। বিবাহিত। বিয়াল্লিশজন বন্ধু । ছবি
দেখে মনে হল রিটায়ার্ড পার্সন । এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে কুড়ি বছরের পুরনো ছবি ।
সে আবার টাইপ করল
অন্য শঙ্কর । ব্যানার্জী , ভুঁড়িওয়ালা । বাঁহাতে টেলিফোন । দুর্গাপুরে থাকেন । ডিভিসিতে
কাজ করেন । পড়েছেন সাইন্স কলেজ কলকাতা । ১৯৮৩ র ব্যাচ । কিছুদিন আগে গুয়াহাটি বেড়াতে
গেছিলেন । বিরক্ত হয়ে অশোক আবার সার্চ করে শঙ্কর। বের হল নীল টি শার্ট ,
চোখে ফার্স্ট ট্রাক পরা হালকা দাড়ি গোঁপের শঙ্কর চৌধুরী । বাড়ি ইলামবাজার । থাকে
শান্তিনিকেতন । স্কাল্পচার , অক্সফোর্ড থেকে ২০০৭ এর গ্র্যাজুয়েট । কয়েকজন মহিলার সাথে হোলি খেলার ছবি ।
চেয়ারে পিঠ ছেড়ে দিয়ে
আধশোয়া হয়ে গেল অশোক । সামনে স্ক্রীন জ্বলজ্বল করছে । হতে পারে আসল লোকটা হয়ত
ফেসবুক করে না । পরক্ষণেই তার মনে হল ফেসবুক করে না এমন লোক আছে ? কে জানে ? মাত্র
আধঘন্টা আগেও সে অফিসের জরুরি কাজে ডুবে ছিল । অথচ এখন ? বিশেষ গুরুত্ব দিল না সে
ব্যাপারটাকে বরং ভাবল জরুরী কাজ সাময়িক মুলতুবি রেখে সে এর আগেও অনেকবার এরকম
ফেসবুক করেছে । আবার সোজা হয়ে
নতুন করে টাইপ করতে শুরু করে । শঙ্করের সঠিক পদবী তার জানা নেই । কিন্তু জানা নেই
বলে কি সে খুঁজবে না ? ঠিক করে শুধু পদবী ধরে ধরে আগে দেখবে , তারপর চেহারা দেখে
সে ঠিক আসল শঙ্করকে চিনে নিতে পারবে । পৃথিবীতে এত মাতাল মেয়েদোষওয়ালা শঙ্কর আছে
যে দেখে সে অবাক হয় । শঙ্কর রায় গুঁই পাল চক্রবর্তী ঘোষ চট্টরাজ লাহা মাজি দাস
মুখার্জী সরকার ভট্টাচার্য হোতা সাহা গুহ মান্না দে দাম হালদার পতি কর্মকার মাহাতো
দত্ত দাশগুপ্ত বাগ কর সেন নন্দী বাউরী খেমড়ী মোদক শাসমল অ্যানিহিলেটর রিএসএসএল
কুন্ডু ঘটক মজুমদার মঞ্জুপুত্র ভক্ত প্রধান বড়ুয়া সাহু
পালিত দালাল ভান্ডারী পুততুন্ড ধীবর হেমব্রম শর্মা শ্রীবাস্তব সিং কোনার তিরকে
গড়াই কেশ পাত্র গোপ মিত্র মুনা ভোজ উজু তন্তুবায় তাঁতী চ্যাটর্জী সোয়াইন মন্ডল
কুম্ভকার জেনা মেসি খান্ডুয়াল গাঙ্গুলী ষড়ঙ্গি প্যাটেল ত্রিপাঠি ভদ্র ইত্যাদি
ইত্যাদি । পদবিগুলো তার সামনে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে।
অথচ ইতিহাসের প্রথা মতো কেউই তাদের নিজস্ব কাজে আটকে নেই। হাল বলদ ছেড়ে কেউ স্টিল
কারখানায়, কেউ পুজোপাঠ ছেড়ে জুতোর দোকানদার। কেউ হিরো সাজার জন্য নিজের পদবি উড়িয়ে
সোয়ার্জেনেগারের সিনেমার নাম নিয়েছে। কেউবা নিজের মায়ের নাম। হঠাৎ সে সম্রাটের মতো
উদার হয়ে যায়। বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেয় আপৃথিবী সমস্ত পদবিদের।
নিজেকে বেশ মুক্ত মনে হচ্ছে । একজনের প্রোফাইলে দেখল রিয়া বৌদি । বাড়ি
দুর্গাপুর । ওর্য়াকিং এ্যস বিজনেস ওম্যান । পাস্ডঃ সেক্স চ্যাট । ভাবী , কলেজ গার্ল , ম্যারেড ওম্যান , স্টাডিস অ্যাট সেক্স ইউনিভারসিটি অফ ইন্ডিয়া, ম্যারেড , ফ্রম
কলকাতা । ফলোয়ার একলক্ষ আশী হাজার । খোলামেলা গল্পগুলো সে
ধীরে সুস্থে পড়ে ফেলে । কিন্তু একফোঁটা উত্তেজনা
বোধ করে না। বরং এতকিছু করার পরও তার বুকের ভেতরের তীব্র কষ্টটা বেড়ে যায়, কিছুতেই কমে না । ওহে শঙ্কর তুমি কি সত্যিই আছো ? তুমি ? না , আপনি ?
এইভাবে প্রায়
রোজই অফিসে বসে ফেসবুকে জোনাকির শঙ্করকে খোঁজা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যায় । মহান সেই
উদাসীনতা সে হারিয়ে ফেলে নাকি নির্লিপ্তি তাকে ত্যাগ করে চলে যায় জানবার আগ্রহ
থাকে না । দুর্গার হাতে
আঁকা কটা ছবি ফেসবুকে পোষ্ট করেছিল আগে । সেই ছবিগুলোই খুলে দেখতে থাকে সে । মনটা
শান্ত হয় তাতে খানিকটা । একটা দড়ি জাতীয় লম্বা কিছুর ওপর কালো কালো পাখির মত কিছু
বসে আছে । দড়ির পাশেই একটু উঁচুতে আর একটা লম্বা টানা সরলরেখা । ড্রইংখাতাটা
অশোকের সঙ্গেই রাখা আছে । টেবিলের ড্রয়ার খুলে বার করল সেটা। ছবি এঁকে খাতাটা
দুর্গা নিজেই অশোককে উপহার দিয়েছে । মেয়েটা কি সত্যি নদী আর নদীর পাড়ে পানকৌড়ি
পাখি এঁকেছে ? ছবি দেখে জোনাকিও তখন বলেছিল , এগুলো পাখিই ।
সাথে সাথে
জিজ্ঞাসা করেছিল অশোক - কি করে বুঝলে ?
- কেন ? সার বেঁধে বসে থাকে একমাত্র পানকৌড়ি ।
- না । ভুল করছ । বেলেহাঁস ওগুলো । পানকৌড়ি
একলা থাকে । অবশ্য যদি ও নদী আঁকে তবেই......
- এইরকম লম্বা সরলেখা টেনে নদী আঁকা তো তুমিই দুর্গাকে শিখিয়েছ ? সেই
প্রথমদিন !
হতাশ হয় জোনাকি - আর কোন পাখি দল
বেঁধে থাকে না, না? আচ্ছা এটা যদি দড়ি না হয় , অন্য কিছু ত হতে পারে !
- এটা দড়িই , শূন্যে ঝুলছে । কত
নদীর পাড়ে এরকম দেখা যায় । ব্যারেজের কথা ভাব ।
- আমি বালির ওপর বসে আছি আর তুমি বলছ সুর্যটা কি সুন্দর ?
অশোক জোর হেসে
ফেলে । - কেন আমি তো বলেছিলাম তুমি অতদূরে থাকছ কেন ? এদিকে এস । যাইহোক কথা সেটা নয় । কথা হল আমাদের পাশ দিয়ে
জলের স্রোত যাচ্ছিল আর বেশ কিছু দূরে উঁচু হয়ে আছে নদীর পাড় । তুমি মনে কর সরু
সুতোর মত স্রোত ডান দিক দিয়ে বয়ে চলেছে আর বাঁদিকে বালি ঠেলতে ঠেলতে অনেক উঁচু
নদীর পাড় । মানে প্রাকৃতিক বাঁধ । সেই বাঁধের ওপর কত পাখি বসেছিল মনে নেই ?
অশোক অবাক হয়ে
চেয়েছিল জোনাকির দিকে । মনে তার বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচল , বুঝতে পারে জোনাকি ।
অশোককে বলে , উঁচু বাঁধ আর দড়ি এক হল নাকি ? কালো পাখি জল ছেড়ে বালিতেই বা থাকবে
কেন ?
- বেলেহাঁস কেবল জলেই থাকে
না । তবে অন্য রঙের হয় কিনা জানা নেই । একট সাড়ে পাঁচ বছরের বাচ্ছা এর চেয়ে আর ভাল কি আঁকবে ?
অশোক ইন্টারনেটে ব্ল্যাক বার্ড সার্চ মারবে ভাবল , তার আগে
তার মনে হল একবার শঙ্কর প্লাস কিছু চেনা জানা
কম্পানির নাম দিয়ে সার্চ
মারলে কেমন হয় ? ভাবা মাত্রই তাই করে ফেলল সে । ফাঁকা স্ক্রীনে ভেসে উঠল , নো
সার্চ রেজাল্ট । এইসব কম্পানিতে কাজ করা কেউ ফেসবুকে নেই জেনে তার অদ্ভূত লাগল । সে খুঁজল
ব্ল্যাক বার্ড । এল একটা জাপানী সুপার ন্যাচারাল সোজো মাঙ্গা । সঙ্গের লেখা আর ছবি
কোনোকো সাকুরাকোজি । কমন ব্ল্যাক বার্ড এল থ্রাস , টুরডাম মেরুলা । সে আবার খুঁজল
ব্ল্যাক কালার বার্ড অফ ইন্ডিয়া । পেল করমোরান্ট বা পানকৌড়ির ছবি । এই পাখি তারা নদীর ধারে দেখেছে । এরা কি উপকুলের পাখি ?
দল বেঁধে থাকে ? দেখতে দেখতে সে আনন্দে কিংডোম , ফাইলাম , ক্লাশ ,
সাবক্লাশ , ইনট্রাক্লাশ , অর্ডার , ফ্যামিলি , জেনাস , স্পেশিস
সব নোট করতে থাকে । নোট করতে করতে আবার দুর্গার আঁকা ছবিটা দেখে । দেখে নদীর উঁচু পাড়ে ডানা মেলে এই পাখি বালির ওপর বসে
বিশ্রাম করছে । দুর্গা শুধু নদীই নয় , বালি পাখি পাড় উঁচু বাঁধ সবই দেখেছে । সে
নিশ্চিত হয় দুর্গার বাড়ী মেদনীপুর অথবা চব্বিশ পরগণা কারণ এটা ত
নিশ্চিত যে ওর মাতৃভাষা বাঙলা । আনন্দে সে তখুনি জোনাকিকে ফোন করে । লক্ষ্য করে না
এখন কটা বাজে । জোনাকির মোবাইল
এনগেজড শোনাল , পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করল সে । তবু এনগেজড । একটু পর রিং ব্যাক করল
জোনাকি নিজেই এবং ভয়ংকর ভারী কন্ঠে বলল , কি হয়েছে ? বার বার ফোন করছেন কেন ? আমি একটু ব্যস্ত আছি।
- না না ! একটু কাজের ব্যাপারে ...
- কি ভাবেন বলুন তো নিজেকে ? মানুষের অন্য কোন সমস্যা থাকতে পারে না ?
কেটে গেল না কেটে
দিল জোনাকি ফোনটা বুঝতে পারল না অশোক । শূন্য স্ক্রীনটার দিকে তাকিয়ে রইল সে
কিছুক্ষণ । একটা বিচ্ছিরি অপরাধবোধ কাজ করল প্রথমে । মনে হল এই সময় ফোন করে খুব
ভুল করেছে সে । কিন্তু খুব বেশি সময় স্থায়ী হল না এই মনোভাব । ধীরে ধীরে প্রচন্ড
একটা রাগ আকার নিতে শুরু করল তার ভেতরে । মনে হল এমন বলিষ্ঠ করে কাউকে অস্বীকার
করা যায় ? আবার সে কম্পিউটার স্ক্রীনে চোখ রাখল , নিজেকে শান্ত করা দরকার । মন
দিয়ে শঙ্করকেই খুঁজে বার করতে হবে । সে লাইকড ইন সার্চ করল ।
লিখল , শঙ্কর প্লাস চেনা কিছু কম্পানির
নাম । এবারে সাথে
সাথেই পেয়ে গেল একজনকে। শঙ্কর ভদ্র । জেনারেল ম্যানেজার , ঝাঁসী । ব্যস , আর কিছু নেই । কোথাকার
পাশ আউট , কত সাল ওসব তো নেই । ছবিও নেই । এছাড়া আরও তিনজন শঙ্করকে পেল সে ? তবে চারজন শঙ্করের মধ্যে সে কাকে
পেতে চাইছে লাইকড ইন সেটা এখন তাকে প্রশ্ন করছে । একজনকে ক্লিক করল অশোক । এর ছবি
আছে তবে অনেক পুরনো । মোটা গোঁপ পুরু চশমা চুলে নিয়মিত ডাই করার ছাপ । প্রথমবার জয়েন্টে পায় নি , বাড়ী বরানগর । না , বোঝা যায় না ইনি
বিয়ে করেছেন কিনা । বন্ধুর সংখ্যা ১৪০ । আর একজন শঙ্করের ছবি নেই তবে
পাশে লেখা শিখা । বউ নিশ্চই । এদের
ছেলে মেয়ের কোন চিহ্ণ দেখতে পেল না । আজ থেকে এরা সবাই অশোকের বন্ধু হয়ে গেল ।
ছবিওয়ালা শঙ্করকেই মন দিয়ে দেখতে লাগল সে । বুকের ভেতরে দমবন্ধ করা চাপা কষ্ট । সে শুনেছে যখন শরীর আর
আত্মা লয় পায় , তখনই প্রকৃত ভালোবাসার অনুভূতি জন্মায় । অথচ তার মধ্যে কোন প্রকৃত
ভালোবাসার জন্ম হচ্ছে না , বরং অসহ্য জ্বালা আর পোড়া । কোল হ্যান্ডেলিং প্ল্যান্টে
একবার আগুন লেগেছিল । সেখানে কয়েক হাজার টন কয়লা জড়ো করে রাখা থাকে । যা দিয়ে
পাওয়ার প্ল্যান্ট বড়োজোর এক সপ্তাহ চলতে পারে । আর সেই সব কয়লার টুকরোর মধ্যে থাকে
উদ্বায়ী গ্যাস । জমা কয়লা স্তুপ
হুহু করে জ্বলে ওঠে । আর একবার আগুন লাগলে নিজস্ব জ্বলন ক্ষমতায় সেই আগুন চারিদিকে
ছড়িয়ে যায় । ধিকি ধিকি আগুন কয়লাস্তুপকে বুকে জড়িয়ে ধরে । ফায়ার ব্রিগেডে খবর
দিয়েও কোন লাভ হয় না । তারা শুধু নিয়ন্ত্রণে রাখে যাতে আর বড় জায়গায়
আগুন ছড়িয়ে না যায় । ঠিক অমনি এক আগুন তার বুকের ভেতরে জ্বলছে এখন । তা ঈর্ষা ঘৃণা
না বিদ্বেষ , বোঝা যায় না ।
এই সময় তার বস দত্তদা তার ঘরে এসে ঢোকে হঠাৎ । সে এত ভয়ঙ্কর
একাগ্রতায় আগুনের উৎস খুঁজছিল যে বসকে দেখে চমকে উঠে কম্পিউটারের মনিটর বন্ধ করে দেয় সে । দত্তদা বলে , কি রে মেয়েছেলের ছবি দেখছিলি ?
সঙ্গে সঙ্গে
স্ক্রীনটা অন করে সে । - না ।
- তাহলে ওরকম করে বন্ধ করলি ?
- এটা ফেসবুক ।
দত্তদা একবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল - তোর যে এ এম সি
কনট্রাক্ট আছে সেই ফাইলটা নিয়ে আমার ঘরে একবার আয় তো । ইউনিয়ন বসতে চাইছে ।
- ইউনিয়ন অ্যানুয়াল মেন্টেনেন্স কনট্রাক্ট নিয়ে কি করবে ?
- কি আবার করবে ? কত টাকার কনট্রাক্ট ,কতজন কাজ করবে , আর কজন ঢুকবে এইসব
খোঁজ খবর করবে ।
- স্কিল্ড টেকনিশিয়ান ? না আনস্কিল্ড ?
- দূর ...! ইউনিয়নের লোক স্কিল্ড হয় ? তুই নেতার কাছে অ্যাপ্লিকেশন করে দেখ যদি দেয় । এখন তাড়াতাড়ি আয় ।
তার খুব বিস্বাদ
লাগছিল । অহেতুক পরিশ্রম । এখন ডকুমেন্ট রুমে গিয়ে ফালতু ধুলো ঘাঁটতে
হবে । সব ফাইল সেফ কাস্টডিতে , একের পর এক স্তুপ করে রাখা । স্টাফেদের খুঁজতে বললে
বলবে , আপনি স্যার খুঁজে নিন । না হলে কাল দেখব , আজ দেখছেন
না কত কাজ । প্রত্যেক দিন কয়েকশো ফাইল আসছে । সব ঠিক এন্ট্রি করা । কার কাছে যাবে নোট করা ।
এখন স্যার হবে না ।
এরকম প্রাচীন
ধুলোতে হাত দিলে তার হাঁচি হয় । তার এও মনে হয় এমন ধুলো অল্প অল্প সরালে বোধহয়
মুঘল আমলের ইতিহাসও বেরিয়ে আসবে । তবে এ এম সি ফাইলটা মোটা হয় । এক একটা কোটেশনের
সাথে আয় ব্যয়ের হিসেব , আগের অভিজ্ঞতা , আর্নেস্ট মানি ডিপোজিট , পি এফ , ই এম
আই ইত্যাদি হাজার বায়নাক্কা জোড়া থাকে ।
ফোর পার্ট টেন্ডার , এরপর ফিনান্স নেগোশিয়েশন , ইভলু্সন কমিটি , টেন্ডার কমিটি , প্রায় একশো রকম রিপোর্ট গোঁজা । চার পাঁচটা হাঁচির পর সে নির্দিষ্ট ফাইল খুঁজে
পেল ।
বসের ঘরে ঢুকে
দেখল ঘর একেবারে ভর্তি । কোনো চেয়ারই ফাঁকা নেই ।
একজন অচেনা লোক বলল - আপনি তো এ বি সি
পাওয়ারের !
দত্তদা এককোণ থেকে একটা ছোট টুল বের
করে দিয়ে বলল , বোস । তারপর ইউনিয়নের দিকে তাকিয়ে বলল - ও কোম্পানীর লোক
।
- হ্যাঁ তাই বলছি ! আপনি এ বি সি
পাওয়ারের সুপার ভাইজার , তাই না ?
- মানে ? আমি কন্ট্রঙ্কটারের সুপারভাইজার হতে যাব
কেন?
- আপনি তো ওদের দেখভাল করেন । করেন না ?
তর্ক করা বৃথা ভেবে
সে মাথা নাড়ায় । প্রত্যেক দিন
ক্ষমতা বদলে যাচ্ছে আর নতুন একদল লোক উঠে আসছে । যারা এই সামান্য কথাটা কিভাবে
বলবে জানেনা , মানুষকে যারা
শ্রদ্ধা করতে জানে নি , তাদের সাথে কথা বলা খুব বিরক্তিজনক । অথচ
ভিড় বাড়িয়েছে এরাই । শব্দের মধ্যে বর্ণ দামামা বাজাচ্ছে ।
- শুনুন আমাদের হিসেব মত আপনাকে দশটা লোক নিতে হবে ।
- কি করে হবে ? এখন কাজ করে পঁচিশ জন । আরো দশজন নিলে তারা কি করবে ?
- কি করবে জানিনা । আমাদের
হিসেব মত দশটাই দাঁড়ায় । দশ পার্সেন্ট লাভ , পনেরো পার্সেন্ট অনান্য খরচ , আর বাকি লোক
, আমরা এটাই বুঝি । আপনার যা কনট্রাক্ট ভ্যালু তাতে আর দশটা লোক নিতে হবে , এটাই
আমরা বুঝি । না পারলে চাকরী ছেড়ে দিন । আপনারা কি কাজ করেন জানা আছে ।
অশোকের চোখ তীব্র
রাগে জ্বলে ওঠে । দত্তদা বলল - তুই এত মাথা ঘামাচ্ছিস
কেন ? লোক বাড়লে তোরই তো ভাল । তুই কনট্রাক্টরকে ফোন কর । আসতে বল ।
অশোক ফোন করে ।
তার মধ্যেই আবার নেতার নির্দেশ আসে । - বলুন , এখনই আসতে হবে । আর সাহেব আপনি ততক্ষণে
অন্যদেরও ডাকুন । সবার ওয়র্ক
অর্ডার দেখতে হবে ।
কনট্রাক্টর এল ।
অনেক লড়াইয়ের পর ঠিক হল আট জন লোক নিতে হবে ।
নেতা বলল - দেখুন আপনারা
সহযোগিতা করলে যে কোন কাজ আরো বেশি লোক দিয়ে ভাল ভাবে করানো যায় । কোম্পানীর এক
পয়সা ব্যয় নেই অথচ কাজ বেশি হল ।
পরে তার বস বলল, এতে কিছু আদান প্রদানও
হল ।
- আদান প্রদান মানে
?
- ল অব কনজারভেশন
অফ এনার্জী । মোট এনার্জীর পরিমান ধ্রুবক , এনার্জী যেখানেই যাক । যে ফর্মেই থাক ।
শক্তির এটাই কাজ । ঠিকঠাক আধার খুঁজে বের করা । আর এখন আগের মত আধার একটা নয়। অসংখ্য ছোট ছোট পকেট ।
অশোকের মাথা যন্ত্রণা করছিল । মনে
হচ্ছিল সব ছেড়ে ছুড়ে কিছুক্ষণ একা একা থাকতে । ঠোঁট দুটো টিপে বন্ধ করে বসে রইল সে । পকেটে
রাখা মোবাইলটা ভাইব্রেশনে আছে । সেটা যে বাজছে বুঝতে পারল সে । কিন্তু রিসিভ করতে
ইচ্ছে করল না । তার হাত শূণ্যে একটা কিছু হাতড়ে বেড়াচ্ছিল ।
আঙ্গুল [
আদর ] জপমালা চায়।
বীজমন্ত্র। চোখ ছুঁয়ে জল নামে।
[ তোর মুখ ] ।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ ।
একদিন মা আসনে
কৃষ্ণ সেলাই করেছিল । গ্রামের বাড়িতে । আমি ছোট । মা । সূর্য উঠছে । এখন মনে নেই । লাল সূর্য । পাশের বাড়ির জ্যেঠিমা লাল চা নিয়ে । পুকুরের পেছনে সূর্য । চলকে চা কৃষ্ণের মুখে । মার মুখ
আগুন । কৃষ্ণ কান্নার নীরব জল পান করেছিল ...।।

Comments
Post a Comment