১৪।
দাদাগিরি.........।।
দুপুর থেকেই খবরটা ছড়াচ্ছিল। সন্তোষ ঝা বাপি পরমানিককে বলল , জানিস তো ...
বাপি ইসমাইলকে বলে, জানো, কী সাঙ্ঘাতিক খবর ...
ইসমাইল সুভ্রাঙ্গিকে বলল, জানেন দিদি ...
সুভ্রাঙ্গি ব্যানার্জিসাহেবকে জিগেস করল, স্যার খবরটা কী
সত্যি?
এমনি করে এক ঘন্টায় সমস্ত কারখানা জুড়ে খবর ছড়িয়ে যায়। তার পরের
ঘণ্টায় বাড়ি থেকে ফোন আস্তে শুরু করে, কারখানা নাকি বন্ধ হয়ে যাবে?
-
কে রটাচ্ছে এইসব আজেবাজে কথা ?
-
অঞ্জন আঁকা শেখাতে এসেছিল, ও বলল।
-
অঞ্জন আজকে ডিউটি যায়নি?
-
না। ওরতো অনেক দিনই কাজ নেই। তোমাদের কি সব হচ্ছে যাতে ছোট কন্ট্রাক্টারের হাতে আর কাজ থাকছে না।
-
হাঁ। একটা বড় কন্ট্রাক্টে বেশী কাজ থাকলে সুবিধা। সুপারভাইজ করার সুবিধা বেশী
আর খরচাও কম।
-
অঞ্জন বলল ওদের কন্ট্রাক্টারের আণ্ডারে মোট পাঁচটা লোক। ওদের কারো আর কাজ নেই।
ঐ লোকগুলো খাবে কি তোমাদের কোম্পানি ভাবছে না?
-
কন্ট্রাক্টারের লোকগুলোর চাকরি তো আমরা দিই নি। আমরা কন্ট্রাক্টে সার্ভিস
চেয়েছি।
-
এখন ঐ লোকগুলোর কি হবে?
-
এটা শুধু আমাদের সমস্যা তা নয়। সারা দুর্গাপুরের সমস্যা। স্পঞ্জ আয়রন
কারখানাগুলো বন্ধ। সব জায়গা থেকে লোক ছাঁটাই। সাথে কোলিয়ারি এলাকাতে হঠাৎ নজরদারি।
বেআইনি খাদান বন্ধ। কয়লা পাচার বন্ধ। এই সব চাপটা দুর্গাপুরের ওপর। কারণ এখানে
এখনো বেশকিছু কারখানা বেঁচে আছে।
-
বাঁচতে না পারলেতো লোকে চুরি করবে?
-
হাঁ। চুরিতো বেড়েছে। গত এক বছরে আমরা কোয়ার্টারর্স ফাঁকা রেখে কোথাও যেতে
পারছি? দুঘণ্টা ফাঁকা পেলেই তো হল, মাল হাপিস।
-
তাহলে সবদিকেই বিপদ।
-
এটশুধু দুর্গাপুরের সমস্যা নয়, সারা পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা। এত মানুষ। কাজ কই?
শিল্প কই? শিল্প মানে শুধু কুটিরশিল্প। শীতলপাটি বানানো। অবশ্য এটা সারা ভারতের
সমস্যা। কোলস্কাম হওয়ার পর পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে পিছুটান। কয়লার অভাবে অনেকে অর্ধেক
কারখানা বানিয়ে ফেলে রেখেছে। ন্যানোর ধ্বংসস্তূপের মতো সারাদেশে অনেক কারখানা।
জন্মের আগে থেকেই মৃত।
ন্যানো নিয়ে আলোচনা পশ্চিমবঙ্গে একরকম নিষিদ্ধ। প্রত্যেকের
ভাব যেন তাতে রাজরোষে পড়তে হবে। নিজেদের মধ্যে কথার সময়ও সবাই সতর্ক।
বিজুদা বলল, বেকার ছেলেরা করবেটা কি? চাকরি নেই, কারখানা নেই।
প্রাইমারি টিচার আর কতজন হবে? এ ছাড়া সিভিক পুলিশ। ডেলি রোজ। কাজ নেই তো পয়সা নেই।
সঞ্জু বলে, পিটিটিআই ছাড়া প্রাইমারি টিচার হওয়া যাচ্ছে না।
সেখানেও নানান কলকাঠি। মামাকাকা।
গত কয়েকদিনের টানাপড়েনে প্রচণ্ড জরুরী কিছু ফাইল দেখা হোয়ে
ওঠেনি। অফিস থেকে যেমন দিয়ে গেছে তেমনই পড়ে আছে টেবিলের ওপর। প্রচুর জরুরি চিঠি
এলোমেলো পড়ে আছে । আজ সকালে অফিসে এসে তার বেশ নোংরা লাগছিলো। তাই প্রথম তিন ঘণ্টা
সে কাগজ গুছালো। এরপর ক্যান্টিন বয় স্বপনকে কড়া করে ব্ল্যাক কফি করতে বলে ফাইল নিয়ে বসল। সে ফাইল থেকে যখন মাথা
তুলতে পারছে না তখন সঞ্জুদা, বিজু এক এক করে তার চেম্বারে ঢুকল স্রেফ আড্ডা মারার
জন্য। অশোক খুব বেশী কথা বলছিল না। এখন সঞ্জুর কথা শুনে ফাইল থেকে চোখ তুলে হালকা
মন্তব্য করল, কেন, তোমার কারখানায় তো কতজন নতুন লোক ঢুকছে।
-
এমনি করে লোক ঢুকে না লোকের লাভ, না কারখানার লাভ।
বিজুদা বলল, মানুষ কি করবে বল? যাদবপুরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার
আলু চাষ করছে। দাম না পেয়ে আত্মহত্যা।
অশোক ভাবছিল ভারতে মানুষ আর টেকনোলজির সম্পর্ক সঠিক ভাবে গড়ে
ওঠেনি। আধখেঁচড়া সম্পর্ক অবিশ্বাস আর ধ্বংস ছাড়া আর কিছু দিতে পারে না। কিন্তু সে
কোন কথা না বলে চুপচাপ থাকল। এমন সময় জোনাকির ফোন। এই ভিড়ের মধ্যে কথা বলা যাবে
না। সে কেটে দিল। জোনাকিকে এসেমেস পাঠিয়ে দিল, কল ইউ লেটার। বিজুদার জিজ্ঞাসু
মুখের জবাবে বলল, পাওনাদার ।
কারখানা ঠিকঠাক না চলার জন্য সাপ্লায়ারকে পয়সা দেওয়া যাচ্ছে
না। তারা একটা জিনিস চেনে, কনট্রোলিং অফিসার। চেক রেডি না হলে তাকে ফোন, তাকে মেল,
গালাগালি। পয়সা দিতে না পারলে কিনেছিলেন কেন? আমরা খুলে নিয়ে যাব। অথবা অনুরোধ,
দেখুন দাদা আমরাও তো চাকরি করি। টার্গেট ফুলফিল না করতে পারলে আমাদের চাকরি থাকবে?
কার হাতেপায়ে ধরতে হবে বলুন, যাচ্ছি। খুব অসহায় বোধ করে।
এমন সময় তাদের সবার মোবাইলে ম্যাসেজ ঢোকে, ইডি মিটিং আট ফোর
পি এম, অ্যাডমিন অফিস।
ব্রজদা বলে, শালা বুড়োটা কি ভাবে কে জানে? সারাক্ষণ দাদাগিরি।
লোকের পেছনে কাঠি করে কারখানা চালাবে? খুচরো মধ্যবিত্ত মানসিকতা। পাছায় চিমটি
কাটলে প্রোডাকশান বেশি হবে ? শনিবার বিকেলটা বরবাদ করে দিল।
সঞ্জু
বদমাইশি করে – বৌদির সঙ্গে এখনও এতো প্রেম? প্রত্যেক শনিবার সিনেমা দেখতে যেতে
হবে?
-
বৌদির সঙ্গে যেতে হবে তোকে কে বলল? নিজের কাজ কর। এমনিতেই আজকে তুই ঝাড় খাবি।
শালা কেউ বাঁচাতে পারবে না। যত পলুউসন তোর জন্যে।
-
আমার জন্যে মানে?
-
তোর ড্রাই অ্যাশ কালেকশান হয় না।
-
হবেটা কি করে? পাইপের বেণ্ড লিক করছে। আর কটা লিক বাড়লে সাড়া দুর্গাপুর ছাইতে
সাদা হয়ে যাবে।
-
লিক করছে লিক সারা।
-
তোমার বৌয়ের লিক সারানো যাবে, এই লিককে কে সারাবে? নতুন বেণ্ড লাগাতে হবে।
-
বৌয়ের ন্যাপকিন লাগা শালা।
-
সেটাও কেনার পয়সা দিচ্ছে কই? বললেই একটাই কথা, কোম্পানির এই অবস্থায় চারদিকে
এতো স্পেয়ার নষ্ট হচ্ছে, আবার আপনারা নতুন মাল কিনতে চাইছেন? পুরনো স্পেয়ারগুলোর
কি হবে? বুড়োগুলো যদি না বোঝে তো এমনিই হবে। বাচ্ছার জিনিস দিয়ে কি বউয়ের কাজ হবে?
-
এ বছরের ছাইয়ের টার্গেট জানিস? ডেলি দু হাজার মেট্রিক টন। এখন অব্দি গড়ে কত
হয়েছে? বছর শেষ হতে চলল।
-
কত হবে দেড়শ দুশ।
-
তাহলে সিমেন্ট কারখানাগুলো সব গুটিয়ে যাবে তো।
-
তোমার প্ল্যান্ট না চললে ছাই কোথা থেকে হবে? সাতদিন চললে দশদিন বন্ধ। সবটাই
আনসারটেন। কেউ নেবে তোমার ছাই?
এই দুপুরে সবাই কেন তার চেম্বারে জড় হয়ে ফালতু বকে যাচ্ছে
অশোক বুঝতে পারে না। মাঝে জোনাকির ফোন সে ধরতে পারেনি। কেটে দিয়েছে। ও জানে জোনাকি
আর ফোন করবে না। এখন ফোন করলে দার্শনিকের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলবে – এখন ফোনটা অতো
জরুরি নয়। কাজগুলো করতে হবে। সারাক্ষণ ফোন করলে কাজ করবে কখন ? তার বসও এমন গম্ভীর
হয়ে কথা বলে না।
হঠাৎই তাদের বস দত্তদা চায়ের গ্লাস হাতে ঘরে ঢুকে পড়ে। - আজ
মিটিং আছে জানিস তো?
-
কী নিয়ে মিটিং, দত্তদা?
-
সব ছাই তো তামলাতে ফেলে দিচ্ছিস!
-
তামলা কই, অ্যাশপণ্ডে!
-
আমাদের অ্যাশপণ্ডে জায়গা কোথায়? ওভারফ্লো হয়ে সব তামলা খাল দিয়ে দামোদরে।
দামোদর বিষিয়ে যাচ্ছে। বায়ো-ডাইভার্সিটি নষ্ট হচ্ছে।
অশোক ভাবে পৃথিবীর কোন্ নদী আজ নিজের মতো বোয়ে যেতে পারছে?
সভ্যতা নদীর দুপাশে ছোঁকছোঁক করছে।
-
তাছাড়া ছাইয়ের ওপর যে সর পড়ে, কি যেন নাম, সিনুস্ফিয়ার, সেটাও ধুয়ে দামোদরে
চলে যাচ্ছে। আর বাকিটা আশপাশের গ্রামের লোক চুরি করছে।
সঞ্জু উত্তেজিত হয়ে বলে, মোটেও গ্রামের লোক চুরি করছে না।
তাদেরকে দিয়ে চুরি করানো হচ্ছে। যে পার্টি কনট্রাক্টটা পেয়েছে সেই চুরি করাচ্ছে।
সে সিনুস্ফিয়ার তুললে যে টাকা কোম্পানিকে দিতে হতো, গ্রামের লোকেদের তার দশ ভাগের
একভাগ দিতে হয়। দুপক্ষের লাভ। উল্টে সারাক্ষণ বলে যাচ্ছে, আমি কিছু পাচ্ছি না।
কতদিন এখানে লোক বসিয়ে রাখব?
-
পারফিউম আর সাজগোজের ইন্ডাস্ট্রিগুলোও বসে যাবে তোর জন্য। কেউ সিনস্ফিয়ার
পাচ্ছে না।
অশোকের রাগ হয়। সে দত্তদার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করে - দেশের
যা অবস্থা একদিন সবই বসে যাবে। ফাইলে প্যাঁচানো প্রশ্ন লিখে যদি ভাল কাজ হয় তাহলে
আসল কাজ তো ঢুঁঢুঁ । যা হবার তা ফাইলের হবে। গায়ে গত্তি লাগবে, ফাইল মোটা হবে।
ফাইলের ছানাপোনা হবে। লিঙ্ক ফাইল হবে। ফাইলের গায়ে সিমেন্টিং হবে। ফাইলের মধ্যে
নদী বইবে। ফাইলের নদীর মধ্যে তৈরি হবে জলজ শ্যাওলা আর ছোটছোট মাছের বাচ্ছা।
দত্তদা বলল , ফাইলের সাতকাহন বলে একটা কবিতা লেখ।
অশোক হঠাৎ বলল, প্লাতা নদীর দূষণে সি-টার্টেলের সংখ্যা ভীষণ
কমে যাচ্ছে। প্লাতা নদী আজ আর কবিতা খুঁজে পাচ্ছেনা ।
-
প্লাতা ? সেটা আবার কি নদী।
-
আর্জেন্টিনার। রিভার প্লেট।
-
রিভারপ্লেট তো একটা ক্লাবের নাম। আর যদি নদীও হয়, তার সাথে আমাদের কি সম্পর্ক?
কদিন ধরে দেখছি তোর মাথাটা গেছে। কি হয়েছে রে তোর ? বউ বাড়িতে আছে তো ?
অশোক চুপ করে থাকে। মাথা নিচু করে ফাইলটা দেখতে থাকে। - শোন্
, আজ বিকেলে কিন্তু গণ্ডগোল হতে পারে। ঠিকঠিক ডকুমেন্ট নিয়ে, প্রিপারেসান নিয়ে
যাবি। সেন্টিমেন্ট কবিতার খাতায় মারিও। ডাটা যেন ঠিক থাকে।
বিজুদা বলল, ডাটা ঠিক থাকলেই চলবে? প্যারামিটার ঠিক না হলে
হবে?
-
সরকারী কোম্পানিতে চাকরি করিস। প্যারামিটার মারাস না। চাকরি বাঁচাতে হলে চুরি
করবি না আর ডাটা ঠিক রাখবি। তাহলেই দেখবি কেউ তোকে ঘাঁটাবে না। কোন প্যারামিটার
কতটা হওয়া উচিৎ বুরোক্রেসি সেসব ভাবে না।
-
প্যারামিটার ঠিক না থাকলে কারখানা চলবে? এক ইউনিট পাওয়ার জেনারেট করতে সাড়ে
ছশো গ্রামের বেশি কয়লা পোড়ালে চলবে? না এক মিলি লিটারের বেশি তেল পোড়ালে তার পয়সা
পাবে?
-
দিনের শেষে ফিরে বউকে আদর করতে চাস, নাকি ...
-
দুটোই চাই।
-
কোন দুটো? বউও চাস আবার... বলে দত্তদা একটু চোখ টিপল। এইতো মরদ হচ্ছিস। বেশ।
বিকেলে বুঝতে পারবি কে কেমন মরদ । দত্তদা আর কোথা না বাড়িয়ে খৈনি দলতে দলতে চলে
গেল।
ভদ্রলোক কোনদিন বিশেষ টেকনিক্যাল আলোচনার মধ্যে ঢুকতে চান না।
কিন্তু নন্-টেকনিক্যাল ব্যাপারে বিশ্বনাথন আনন্দের মত এমন চাল দেন যে পাঁচটা চাল
আগে বোঝা যায় না ঘটনা কোন্ দিকে এগোচ্ছে। তারা পরস্পরের দিকে হতবম্ব হয়ে তাকিয়ে
থাকে। কিছুই খোলসা হয় না। বিকেলে কি বোঝা যাবে? দত্তদার কাছে অনেকরকম আগাম খবর
থাকে। বিকেলে যে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের সাথে মিটিং সেখানে বিশাল ঝাড় খেতে হবে এটা
বেশ বুঝতে পারল। আড্ডাটা আর জমল না। সবাই উঠে পড়ল। অশোক ঘড়ির দিকে তাকাল। সবারই
লাঞ্চ টাইম। জোনাকির মেয়ে, বর এই সময় ফিরবে। ফোনটার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে সে
লাঞ্চে যায়।
লাঞ্চ শেষে কেউ সোজা কারখানায় ঢুকল। কেউ একটু দেরি করে হালকা
একটা ঘুম দিয়ে চলে গেল বোর্ডরুমে। তাদের সবার নজর পড়ল অস্বাভাবিক পরিবেশের দিকে।
কেমন থমথমে। রাস্তায় আসতে আসতে নানান দিকে অস্বাভাবিক মানুষজন। এক একটা গ্রুপে তিন
থেকে চার জন। চোখমুখ হালকা টেনস্ড। ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভঙ্গিটা স্বাভাবিক বা
সাবলীল নয়। ছুটি হবে বিকেল পাঁচটাতে। তার আগে এই পৌনে চারটেতে এত লোকজন দেখার কথা
নয়।
অশোক মিটিং এর জন্য উঠে পড়ে। এসে দেখল, দত্তদা আগেই চলে
এসেছে। তাকে দেখে বলল, আয়, আয়। বোস। কি দেখলি? টেম্পারেচার কেমন আছে?
-
এখানে ঠিক আছে। বাইরে শোয়টার গায়ে রাখা যাচ্ছে না।
-
গরম না গুমোট?
এখনও শীত শেষ হয়নি। দত্তদা গরমের গল্প কোথায় পাচ্ছে ভেবে সবাই
অবাক হয়। অশোক মজা করার জন্য বলল, গুমোট গরম।
-
তবে আর কি এই ঠাণ্ডা ঘরেই বসে থাক। এখান থেকে বের হবার দরকার নেই। আমিতো তিনটে
থেকে এখানে বসে আছি।
-
ঘুমিয়ে নিলে?
-
বলতে পারিস। আমার তো আর তোদের মতো রিপোর্ট দেওয়ার নেই।
বাইরে অল্পসল্প লোক জমা হতেই থাকল। ডিসিএল, রাতুরিয়া,
অঙ্গদপুর, গ্যামন ব্রিজ, এমএএমসি, জয় বালাজি, ডিভিসি মোড়, করঙ্গ পাড়া, শ্যামপুর,
সগড়ভাঙা, এস বি মোড়।
গ্যামনে বারিন শ্যামলকে বলল, তোর জামাটা গুঁজে পরে আছিস কেন?
পেটের কাছটা উঁচু হয়ে আছে। জামাটা খুলে দে।
ডিভিসি মোড়ে জিতেন লাবুকে বলল, ব্যাগটা সাবধানে রাখ্। বেশী
নাড়াচাড়া করলে শেষে ফেটে নিজেই মরবি।
জয় বালাজির সামনে ডেভিড সিরাজকে বলল, গায়ে জোর না থাকলে ছুরি
লাঠি নিজের পেছনেই গুঁজে দেবে।
সিরাজ বলল, মাকা দুধ পিয়া।
ডিসিএল এ গোরা নিজের পেটের কাছটা একবার দেখে নিয়ে হাত পাতল
মুন্নার সামনে। - দে, খৈনি নিজে না ঘষলে আরাম হয় না।
দত্তদা বলল, এমনিতে গুজব, পল্যুসানের জন্য কারখানা বন্ধ হয়ে
যাবে, তার ওপর আবার ইউনিয়নের এ-টিম বি-টিমের ঝামেলা।
-
কারা ক্ষমতায় আসবে বলে তোমার মনে হয়?
দত্তদা নিজের বাইসেপটা একবার চেপে দেখে নিয়ে বলল, যারাই আসুক
তোর আমার কিছু পরিবর্তন হবে না। মনে রাখিস তুই আটটা লোক ঢুকিয়েছিস। নিজের মাইনে
পাওয়ার ঠিক ঠিকানা নেই আবার অন্যের পেছন চুলকে দিচ্ছিস। এরাতো
পার্মানেন্ট বোঝা। ঐ আটটা লোককে আর কখনো কমানো যাবে? অন্যসব ডিপার্টমেন্ট নিয়ে তিনশ আঠেরোটা।
বেকারভাতা দেবার মতো এগুলোকে পুষতে হবে। তোরা আবার প্যারামিটার মারাচ্ছিস। আমার আর
কি? তিন বছর চাকরি। আজকেই ছেড়ে দিতে পারি।
বাজারে জোর গুজব, ছেলেগুলো এক লাখ, দেড় লাখ দিয়ে কনট্রাক্টারের কাছে দশ হাজারি চাকরিতে
ঢুকেছে। যদিও সবাই ডিএমসির লেবার রেটের সবটা পায় না। কিছু এদিক ওদিক চলে যায়।
খবরের সত্যিমিথ্যা অশোক জানেনা।
যখন এক এক করে কারখানা বন্ধ হচ্ছে, যখন পৃথিবী জুড়ে ইস্পাতের
চাহিদা কমছে, যখন দেখে পাওয়ার প্লান্টের ফ্রিকোয়েন্সি পঞ্চাশের ওপর – বিদ্যুতের
চাহিদা নেই, যখন ফ্ল্যাটের দাম কমছে, যখন ন্যানোর খাঁচা ভৌতিক দাঁড়িয়ে থাকে,
এমএএমসি রুইয়ারা কিনলেও চালু হয় না। এমনকি রাশিয়া, আমেরিকা, ওপেক আর ইরানের নিজস্ব
লাভ লোকসানের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পড়তির দিকে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে
একটা চাকরি মহা মূল্যবান। সেই চাকরির জন্য শুধুমাত্র বাবার পি এফ এর জমানো টাকা
কেন নিজের প্রাণ পর্যন্ত বাজী রাখা যায়। তারা সব দুর্গাপুরের দ্বিতীয় বা তৃতীয়
প্রজন্ম। যাবার অন্য কোন জায়গা নেই। চাসবাস দেখেছে মানাতে, পিকনিক করতে গিয়ে।
দুর্গাপুর ছাড়া অন্যকিছু তাদের সুদূর চিন্তার বাইরে।
ইডি সাহেবের আসতে এখনও অনেক দেরি। তারা মিটিং এর জন্য প্রায়
একঘণ্টা বসে আছে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় পাঁচটা ছুঁইছুঁই। অশোক উসখুস করতে করতে একবার
উঠে দাঁড়ায়। গত কয়েকদিন জোনাকির সাথে কোন কথা হয়নি। কোন এস এম এস আসেনি। গত
কয়েকদিন ধরে কোন কারণ ছাড়া চোখের ওপর নিমেষে জল জমা হয়। মাঝেমাঝে মনে হয় তাদের এই
এতদিন ধরে চলা সম্পর্কটা প্রেম নয়, আসলে একটা বিরোধিতা। একটু একটু করে প্রবল হতে
থাকা কৌতূহল। যতই সেই কৌতূহলের জবাব পেতে থাকে, যত জানতে থাকে তত তৈরি হয় আক্রোশ।
তখন চোখের জল শুকিয়ে ঘাড়ের পেছনটা আগুন গরম হয়ে ওঠে। মনে হয় সবকিছু ভাঙচুর চালানো
দরকার। সম্পর্ক, শিশি বোতল, ঘরবাড়ি, গোলাপ।
অশোক ওঠে। মিটিং এর আগে নিজেকে শান্ত করা দরকার। যদিও এই
দাউদাউ আগুন শান্ত করার সঠিক রাস্তা তার জানা নেই। ক্ষোভ উগরে দেওয়ার জন্য জনাকি
তার ফোন ধরবে না। সকালে সে নিজেই ফোন কেটে দিয়েছে। নিজেকে অস্থির লাগে।
দত্তদা ধমকে বলল, এই কোথায় যাচ্ছিস?
এখান থেকে
বের হতে পারমিসান লাগবে নাকি? সে বিরক্ত হয়ে বলে – টয়লেট।
দত্তদা শাসন করার ভঙ্গিতে বলে, এখন কোথাও যাবি না।
-
কেন, মিটিং শুরু হতে তো দেরি আছে।
দত্তদা একবার ভাবল। তারপর বলল, এটাই সবথেকে সেফ জায়গা, তাই
যাবি না।
বোর্ডরুমের এই জায়গাটা কারখানার ভিভিআইপি জোন। এমডি, ইডি,
চেয়ারম্যানের চেম্বার। বোর্ড রুম। সিসিটিভি। গোটা কয়েক বন্দুকধারী সিকিউরিটি। সব ঠিক
আছে। কিন্তু তার ঘাড়ের পেছনের ঘামের জন্য এটাও কোনভাবে সেফ নয়। বুকের মধ্যে
নিরন্তর চলতে থাকা চিনচিনে ব্যাথা। অশোক জোর করে ওঠে।
দত্তদা এবার রীতিমতো রেগে ওঠে, এই গান্ডু, কতবার বলছি বাইরে
যাবি না। বাইরে মারপিঠ শুরু হয়েছে।
অশোক কিছু বুঝতে না পেরে আবার বসে পড়ে।
বোর্ড রুমের ভেতর দিয়ে বাইরেটা কিছু দেখা যায় না। জানালা নেই।
ঘরটাতে সেন্ট্রাল এসি ছাড়াও আছে চারটে তিন টনের স্প্লিট এসি। কোন শব্দ নেই। ঠিক
পেছন দিকে লম্বা শালগাছে এখন অল্প কচিপাতা গজিয়েছে, সেটাও দেখা যায় না। তাই তারা
চুপচাপ বসে রইল। বাইরে এখন রোদ কতটা সে খবর একমাত্র দত্তদার কাছে আছে।
দত্তদা মোবাইলটা চোখের সামনে তুলে চোখ কুঁচকে থাকে। তারপর
বলেই ইডির গাড়ি অ্যাডমিনিসট্রেটিভ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশ থেকে লোকজন
ঘিরে রেখেছে গাড়িটাকে।
যারা বোর্ডরুমের ভেতরে তাদের চোখমুখে গভীর উদ্বেগ ফুটে ওঠে।
ঘাড়ের পেছনটা অল্প ঘামে। চারপাশে যা চলছে একবার মারমুখি জনতার সামনে পড়লে বদন
পাল্টে যেতে পারে। এতক্ষণ না পাওয়া গেলেও, সবাই এত সন্তর্পণে নিঃশ্বাস ফেলে যে
বোর্ডরুমের এসি থেকে একটা চিনচিনে শব্দ পায় অশোক।
ইডির ঝকঝকে সাদা স্করপিও গাড়ির ঈষৎ কালো কাঁচ। ভেতরে আলো না
জ্বললে একটুও বোঝা যায় না কে বসে আছে। তাই ইডির চোখমুখের চেহারা এখন স্বাভাবিক না
অস্বাভাবিক, ভীত সন্ত্রস্ত কিছুই বোঝা যায় না। শুধু এতুকুই বোঝা যাচ্ছে যে ভেতরে
একটা মানুষ কাঠের মতো পড়ে আছে। বিশেষ নড়াচড়া সেই। দু দিকের দরজা থেকে সমান
দুরত্বে।
বাইরে একটা ভিড় ঘিরে ধরে গাড়িটাকে জোর ধাক্কা দিচ্ছে। কেউ
একটা বড় রড দিয়ে সিসিটিভিটাকে ভেঙে ফেলে। হাতের চাপড়ে গাড়ির মধ্যে প্রবল আর্তনাদ।
গেটের সিকিউরিটিকে দেখা যাচ্ছে না। ভিড়ের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেছে। ড্রাইভারের
পাশে বসে ইডির নিজস্ব সিকিউরিটি কি করবে বুঝতে পারে না। অসহায়ের মত সে ফোন করে
চলে। তার হাতে লাঠি আর মোবাইল ছাড়া আর কোন অস্ত্র নেই। গাড়ি যে ভাবে দুলছে, যে কোন
সময় উল্টে যেতে পারে। বেশ কিছুক্ষণ এমনি চলার পর কেউ লাঠি এনে গাড়ির ওপর মারতে
থাকে। গাড়ি তুবড়ে যেতে থাকে। ব্যাকলাইট ঝুরঝুর করে ভেঙে যায়। দূর থেকে কয়েকজন সিটি
বাজাতে থাকে। বেশ উৎসব মুখর পরিবেশ। কেউ উঁচু জায়গা থেকে চেঁচাল, গাড়ির বডিতে না
মেরে কাঁচে মার। তাহলে মালটাকে বের করে ফেলা যাবে।
কেউ সেই চেঁচানো শুনতে পেল কিনা বোঝা গেল না। প্রত্যেকে নিজের
মত মজা পেতে ব্যাস্ত। লাঠিটা গাড়ির গায়ে লাগতে লাগতে এক সময় কাঁচে লাগে। তখন
সন্ধ্যে নেমে এসেছে। ছটা বাজে। দৃক-সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে তখন শুভক্ষণ। একটা লাঠির
আঘাতে কাঁচের ছোটছোট কেলাস ছড়িয়ে পড়ল রাস্তা জুড়ে। প্রথমে সবাই পিছিয়ে গেল।
মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। এরপর সমবেত চিৎকার মুখর হল।
লেবার কলোনির ফিকরু জমাদারের ভাইয়ের মুখ থেকে তখন দারুর গন্ধ। সেই টাই
ধরে টেনে বের করল ইডিকে। কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে বলল, শালা, আবার সাজগোজ করা হয়েছে। টাই পরেছে।
তার প্রথম থাপ্পড়টা পড়ল ইডির গালে।
বাকিরা কি করবে বুঝতে পারে না। কেউ একজন লুকিয়ে পেছন থেকে
একটা চাটা মারে। ইডির বডিগার্ড কিছু বুঝে ওঠার আগে ইডি ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যান।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইডির বডিগার্ড দেখল জনা চারেক গাট্টাগট্টা চেহারার লোক সেই ভিড়ের
ভেতর থেকে ছোঁ মেরে ইডিকে তুলে দূরে দাঁড়ানো গাড়িতে তুলে কোথায় চলে গেল।
রাতের অন্ধকারে টিভি ক্যামেরা কোন ছবি তুলতে পারে না। তাদের
হাতে যা পড়ে থাকল তা শুধু আইসিইউতে পড়ে থাকা ইডি, মাথা ফাটা দামোদর লাহা, রাখহরি
বাদ্গি আর রামকেষ্ট কোনার। এ-টিম, বি-টিম উভয়েই দাবি করে সবাই তাদের দলের। তারা
ইডিকে বাঁচাতে যায়, আর অন্যদল তাদের ওপর অকারণে আক্রমণ করে। যদিও মহানগর থেকে অনেক
দূরে, আর সঠিক ভিডিও ফুটেজের অভাব। খবর হিসেবে তা দাগ কাটতে পারে না।
টিভির খবর বিশেষ না দেখার জন্য তাপু বুঝতে পারে না অশোক কেন
ঘরে ফিরতে এত দেরি করছে। ফোন করতে তার একটুও ইচ্ছে করে না। ঝুড়িঝুড়ি মিথ্যের ডালি
নিয়ে বসে যাবে। জোনাকিকেও তার অদ্ভুত লাগে। চারপাশে এত ব্যাচেলার ছেলে ঘুরে
বেড়াচ্ছে তাদের কারো ঘাড়ে চেপে বসতে পারে! তার মধ্যে প্রচণ্ড রাগ জন্ম নিতে থাকে।
পড়াতে বসে ছেলেকে দুটো থাপ্পড় মেরে বসে।
অশোক ফিরল যখন রাত সাড়ে নটা। ছেলে উঠে এসে বলল, বাবা তুমি কি
এনেছ?
তাপু ছেলেকে ধমক লাগায়, তুমি উঠে এসেছ কেন? বাবা এসেছে বলে
আহ্লাদ করার কিছু হয় নি। একজন সাত ঘাটের জল খেয়ে ফিরছে বলে তুমি পড়া নষ্ট করতে পার
না। যাও।
পুটু মুখ নিচু করে চলে যায় পড়ার ঘরে। অশোক প্রচণ্ড কষ্ট পায়।
ছেলেটাকে একটু আদরও করতে পারল না।
তাপু জিগেস করল, খেয়ে আসা হয়েছে, না কিছু খেতে দেব?
অশোক কোন উত্তর না দিয়ে বাথরুমে ঢোকে। ট্যাঙ্কের ঠাণ্ডা জল
মাথায় ঢালতে থাকে। কষ্টগুলো জলের সাথে ঝরে যায় না । কষ্টগুলো
জমতে থাকে, বরফ হতে থাকে।
তারা জানতে পারল না, ইডি কোমাতে। কারখানায় সাস্পেন্সান অফ ওয়ার্ক
জারি হয়েছে। নাইট শিফট থেকে প্রডাকশান বন্ধ।

Comments
Post a Comment