জোনাকি আজো শুয়ে আছে । গ্রীষ্মের দুপুর । বাইরে ঝলসানো গরম । দোতলার ছাদ
থেকে লু নামে । পাখাটাকে হালকা চালাল । মুখ নাকের জলীয় বাষ্প শুকিয়ে আসে । দম বন্ধ
হয়ে যায় ।
বাইরে নিম গাছে যে
বসন্ত বৌরি ডাকছিল সেটা এখন চুপ করে গেছে । জোনাকি ভাবছিল এখন কি করা যায় ? ঘুম আসছেনা । মোবাইলে
সময় দেখল বারোটা তিরিশ ।
মেয়ের স্কুল থেকে ফিরতে আরো ঘন্টা খানেক । কোথায় কাজ আছে বলে চন্দনও আজ বেশ সকাল
সকাল বেরিয়ে গেছে । সন্ধ্যের আগে ফিরবে না
। মোবাইলটা নিয়ে খেলতে
খেলতে সে লিখল, তোমার জন্য এসি ব্লোয়ার, ঠান্ডা লস্যি, চিলড্ তরমুজ, কোঙ্কনি আখের রস, এক কলসি আরাম জল, ডার্মি কুল পাউডার আর পৃথিবী উলটে
কালবৈশাখী ।
তারপর কল
রেজিস্টারের নামগুলো একে একে পড়তে লাগল ।
কিন্তু কাউকেই তেমন পছন্দ হল না । শুধু
একজন ছাড়া । ইতিহাসে এই নাম খুব বিখ্যাত । অশোক । একটা মাহাত্ম আছে । মহারানী
শুভদ্রাঙ্গীর পুত্র , মুরার প্রপৌত্র । মুরাই কি
সেলুকাসের কন্যা যাকে চন্দ্রগুপ্ত বিয়ে করেছিল ? কল রেজিস্টারের অশোক একটু ক্যাবলা
গোছের । অন্তত জোনাকির তেমনই মনে হয় । দুপুরের
আলস্যে তার অতীত বর্তমান সব এক হয়ে যায় । ঘুম ঘুম চোখে সে বর্তমানের অশোককেই দিল
এস এম এসটা পাঠিয়ে । দিয়েই তার মনে হল ইতিহাসে এই মানুষটার আরও একটা সুন্দর নাম আছে । পবন । রাজপুত্র
সুসীম যাকে দুচোক্ষে সহ্য করতে পারতনা । কারণ অকারণে সুসীম কেবলই পবনকে অপদস্থ করতে চাইত ।
নানান ফন্দিফিকিরে পবনকে অসম প্রতিযোগিতায় আহ্বান জানাত যখন তখন । মজা এই ,
প্রতিবারেই পরিস্থিতি এমনই দাঁড়াত যে জয়মাল্য যেত পবনের গলায় , আর স্বয়ং পিতা
মহারাজ মানে সম্রাট বিন্দুসার সেই বিজয়
মাল্য পবনকে পরিয়ে দিতেন । জোনাকি সেই মুহূর্তের পবনের উদ্ভাসিত মুখমন্ডল মনে করার
খুব চেষ্টা করল , কিন্তু পারলনা । বদলে অশোকের ভীতু ক্যাবলাটে চেহারাটাই তার মনে
এল । আর মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পেট
গুলিয়ে তার দারুন হাসি পেল ।
বাইরে চূড়ান্ত লু বইছে । শেষ এপ্রিলের এই সময়টায় দুর্গাপুরে চরম শুকনো
আবহাওয়া । ভর দুপুরে রাস্তাগুলো ঠকঠকিয়ে কাঁপে । গাছের পাতায় ডাইনীর হাসির মত
তীব্র শব্দ ওঠে । এস এম এসটা দুর্গাপুর ছাড়িয়ে ডানকুনির কাছাকাছি মোবাইল খুঁজে পেল
। অশোক দুর্গাপুর ফিরছে । জানলার ঠিক পাশের সীটটাই । চ্যাটচ্যাটে ঘামটা তাই শুকিয়ে
গেছে । সে ঘুমোচ্ছে । কারণ দুরপাল্লার যে কোন বাসে চড়লেই তার খুব ঘুম পায় । আপনা
হতেই চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে । কিন্তু বাসটা যদি এসি হয় তাহলে হবে না । তখন তার
ঘুম কোথায় হারিয়ে যায়। এর সঠিক কারণটা সে নিজেও জানে না । যাইহোক সে খুব নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোচ্ছিল । এমন সময় এস
এম এসটা কাঁপতে কাঁপতে তার মোবাইলে ঢুকলো । সব এস এম এসের মত এটাও সে ঘুম ভেঙে তখুনি মন দিয়ে পড়ে ফেলল । কিন্তু
মানে কিছুই বুঝতে পারলনা । জোনাকি তার স্বল্প পরিচিত । মাঝে মধ্যে দেখা টেখা হলেও
কথা খুবই কম হয় । প্রয়োজন পড়েনা , মানে আজ অব্দি পড়েনি । জোনাকিকে সে অন্যের সঙ্গে কথা
বলতে দেখেছে খুব হেসে হেসে । জোনাকি তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে সে বরাবর দায়সারা
গোছের একটা উত্তর দিয়ে প্রয়োজনটাকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে । এটা শুধু জোনাকি বলে নয়
, এটা তার স্বভাব । এইরকম নির্লিপ্তি । এ
কারণে তার মুখে চোখে উদাসীনতার একটা স্বর্গীয় আলোছায়া সব সময় খেলা করে । সে
আলোটা এতই তীব্র যে তার রোশনি গিয়ে ছিটকে পড়ে তার দু পায়ের পাতায় ও আঙুলে । কিন্তু প্রায় সবসময় তাকে সেফটি জুতো মোজা পড়ে থাকতে
হয় বলে তার পা সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না । এদিকে জুতোর কারণে মুখ সবসময় ভার । আর মিড লেভেল অফিসারদের এইরকম ভার
ভার মুখ না হলে চলেওনা ।
জোনাকি কখনো তার কোন ব্যাপারে আজ অব্দি উৎসাহ প্রকাশ করেনি । এখন হঠাৎ এক
ভাঁড় কোঙ্কনি আখের রস নিয়ে উপস্থিত । সে ভাবল তার নাম এ দিয়ে শুরু হওয়ার জন্য
মোবাইলের প্রথম দিকে থাকে । ফলে
ভুল করে প্রচুর এস এম এস তার কাছে চলে আসে । এটা বোধহয় সেইরকমই । তবে ভুল হলেও এস এম এসটা তার
বেশ পছন্দ হল । বেশ মিষ্টি আর ঠান্ডা ।
সে জানলা দিয়ে বাইরে তাকায় । ন্যানো কারখানার খাঁচাটা দেখা যাচ্ছে । আগের
বার সে এই কারখানাটাকে কেমন দেখেছিল এটা ভাবতে ভাবতে সে আবার দুচোখ বন্ধ করে ।
শক্তিগড়ের ল্যাংচার দোকানে ঢোকার আগে পর্যন্ত আবার একটা নিশিন্ত ঘুম । মাথার ভেতরে
তার নানান ভাবনা খেলা করে যায় । তার
মনে হয় ন্যানোর কারখানার সঙ্গে এম এ এম সি কারখানার তফাৎ কোথায় ? এম এ এম সি হারিয়েছে কিছু শ্রমিক যাদের নিজেদের
চাষের জমি ছিল না , মাছ ভরা পুকুর ছিল না গোয়ালের গরুও ছিল না । গ্রামের ঠিক বাইরে
বট গাছের নীচে ঝুঁকে পড়া শীতলা ঠাকুর ছিল না । সঙ্গী ছিল কেবল নিজের মেহনত । তারা
দেখেছে অ্যাসেম্বলি লাইন । একজন
সিমের ওপর ওয়েলডিং
করছে , অন্যজন সেটা ধরে আস্তে আস্তে বাঁকিয়েছে । আবার অন্য কেউ হিট ট্রিটমেন্ট
করেছে । জমিতে বীজ ছড়ানো , জলসেচ , বেড়ে ওঠা চারার মতই তৈরী হয়েছে নিজের কাজের
প্রতি অসীম মমতা । ন্যানো কারখানার তল্লাটটা যেন যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর
যুদ্ধক্ষেত্রের মত । যারা
একদিন দাপটের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল চর্তুদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাদের কাটা মুন্ডু ।
গুরুত্বহীন । বিশেষ উদ্দেশ্য
প্রণোদিত। রাজনীতির নজর যাতে অন্যদিকে ঘুরে যায় । এইসব হাড়গোড় সেইজন্য । সবার অলক্ষ্যে লাশ পচছে
। বাকি যারা বেঁচে আছে তাদের চোখে সেই প্রথম জীবনের স্মৃতি । গ্রামের মানুষ বা শ্রমিক দুজনের চোখেই । বাসটা
ছুটছিল , সেই সঙ্গে
অশোকের চিন্তা ।
বেশ কিছুদিন পরের কথা । মঙ্গলবার । সে হেঁটে আসছিল এয়ার কম্প্রেসরগুলোর পাশ দিয়ে । রোজ
এগুলোর ওপরে একবার করে চোখ বুলিয়ে নেওয়া তার নিত্যিকার রুটিন । এইসময় দ্বিতীয় একটা
এস এম এস তার মোবাইলে এসে আছড়ে পড়ল । ‘ সম্পর্ক একটা ঘড়ির কাঁটার মত । খুব কম সময় তাদের দেখা হয় । কিন্তু
সারাক্ষণ তারা পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকে ।’ জোনাকি !
অশোকের মনে হল এস এম এসটা ভুল করে আসেনি । অনেকটা ইচ্ছা করেই পাঠানো হয়েছে
। তার স্বভাবজাত নির্লিপ্ততায় সে এস এম এসটার দিকে চেয়ে একটু হাসল । মনে হল
জোনাকির সঙ্গে শেষ কবে তার দেখা হয়েছিল ? কি কথা বলেছিল তারা দুজন ? ছুটির
দিনগুলোয় অশোক তাদের সাপ্তাহিক সাহিত্যের আড্ডায় যায় । জোনাকি সেখানে আসে । সেখানে সবাই সবার সঙ্গে
হাল্কা হাসি ঠাট্টা করে । এই শণিবার সেখানে গিয়ে অশোক একটু অন্যভাবে লক্ষ্য করতে
লাগল জোনাকিকে । কিন্তু না , কোন বিশেষ
কিছু তার নজরে এল না । এস এম এসের কোন চিহ্ণই সে দেখতে পেল না । এই প্রথম সে বেশ অবাক
হয় , দামোদরের মত গম্ভীর নদী দক্ষিণ পূর্বে প্রবাহিত হইতেছে । কোনদিকে কোনরূপ বাঁক নাই ।
দুদিন পর এক রাত্রে আবার সে এস এম এস পেল । লেখা , কটা পথ শিশুকে গল্প
শোনানো হল ?
অশোকের মনে হল এটা একটা ব্যঙ্গ আর তাকে লজ্জায় ফেলবার জন্য এস এম এসটা লেখা
হয়েছে । তাদের সংগঠনের অনেকগুলো স্লোগানের মধ্যে একটা স্লোগান এইরকম , আরো অনেক
কিছুর সাথে পথ শিশুদের গল্প শোনান । কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও একটা
পথশিশুকে কেউ তারা গল্প শোনাতে পারে নি । আসলে পথশিশুরা কোথায় থাকে সেটা তাদের
কারুরই ঠিক জানা নেই । এইসব শিশুদের বাসে ট্রেনে ঝাড়ু লাগাতে দেখেছে , ভিক্ষা
চাইতেও দেখেছে , কিন্তু সারা দুর্গাপুর শহরে একটাও পরিতক্ত শিশু চোখে পড়েনি ।
এমনকি এম এ এম সি
কারখানার আশেপাশের বস্তিগুলোতেও নয় ।
তার মনে হয় দুর্গাপুর শহরটা বেশ নতুন বলে এখানে পথশিশু তৈরী হয় নি ।
কোলকাতার রাস্তায় যেসব নোংরা , জুতোর কালি মাখা পথশিশুদের দেখতে পাওয়া যায় অশোকের
মনে শুধু সেইসব শিশুদের ছবিই আঁকা আছে , তাই জোনাকি যখন তার পরবর্তী এস এম এসে
লিখল , একটা পথশিশু নিশ্চয় তোমাদের গল্প শুনে খুশি , সেইদিনই প্রথম অশোক জোনাকির সাথে কথা বলল। সে প্রশ্ন
করে - দুর্গাপুর শহরে প্রচুর কারখানা আছে সত্যি , কিন্তু একটাও পথশিশু নেই কেন
জানেন ?
জোনাকির মত সে কিছুতেই তুমি সম্বোধন করতে পারলনা । তুমিটা তার এলনা ।
তার প্রশ্ন শুনে উল্টে জোনাকি তাকে প্রশ্ন করে বসল, আচ্ছা পথশিশুদের গল্প
শোনাবার ইচ্ছা হঠাৎ তোমাদের কেন হল ?
- আগে তো বুঝিনি যে দুর্গাপুর
এত সুসভ্য শহর । অশোক স্বভাবসিদ্ধ লজ্জা পায় অথবা মহান সেই উদাসীনতা তাকে আচ্ছন্ন
করে ।
- পথশিশুদের কাছে আমি
তোমাকে নিয়ে যেতে পারি । চাইলে যেতে পার ।
- কোথায় ?
- গেলে দেখতে পাবে , তবে
সময় লাগবে । তাড়াতাড়ি হবে না । আর এইরকম গম্ভীর থাকলেও হবে না । সারাক্ষণ চাকরীর কথা
ভাবলে হবে ?
অশোক বলল - না না যাব ।
কবে যাবেন বলুন , কাল ?
-
কাল যাবেন ? ঠিক আছে । আমার বাড়িটা চেনেন ? চার নম্বর
সিটি সেন্টার । বিকেলে এলে
একসঙ্গে যাব । তাকে দেখে জোনাকিও তুমি থেকে আপনিতে চলে গেল ।
সে জবাব দিল , ঠিক আছে । কথা
বলা হয়ে গেলে সে একটুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইল যা সে দীর্ঘ বিশ বছর ধরে চাকরী সূত্রে
উপার্জন করেছে । এই গাম্ভীর্য সে সহজে হারাতে পারবে না । অনেকটা কর্ণের কবচ
কুন্ডলের মত । আজকাল তার বড় বেশি উপমা চলে আসে কিন্তু কিছু করার নেই । এবং এই
উপমাকে আড়াল করবার জন্যই বোধহয় সে আরো বেশি নির্লিপ্ততায় চলে যাচ্ছে । কোন পক্ষপাত করবে না সে । এটাই বোধহয় ভবিতব্য ।
জোনাকির মনে কোন দ্বিধা নেই । অনায়াসে বাড়িতে ডেকে নিল । বেশ । সে শুধু আদেশ পালন
করবে । যেখানে নিয়ে যেতে বলবে সেখানে যাবে । তখন তাকে দূর থেকে কেমন দেখাবে সে
জানে না । জানবার কোন
ইচ্ছেই তার হবে না ।
বিকেলে বেরিয়ে জোনাকি কিছু বিস্কুট আর দুটো মোমবাতি কিনল । অশোক ভাবল এগুলো বোধহয় জোনাকির
নিজের ঘরের জন্য । ভুলটা ভাঙল তারা যখন দুজনে একসঙ্গে মিশনারিজ অব চ্যারিটির বড়
গেটের সামনে এসে দাঁড়াল । অশোক দেখল খুব সাবলীল ভাবে জোনাকি ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে ।
কোন জড়তা নেই । এদিকে নিজে সে বেশ অনুভব করল তার বুক ঢিবঢিব করছে । রাস্তা দিয়ে
আসবার সময় সে আর জোনাকি একই বাইকে চেপে এসেছে । সে চালিয়েছে আর জোনাকি পেছনে ।
মহিলা তখনো বেশ স্বাভাবিকই ছিল । সারা রাস্তা তারা একটাও কথা বলেনি । এখন গেটের ভেতরে ঢোকার পর জোনাকি পেছন ফিরে
তাকে জিজ্ঞেস করল , আপনার খারাপ লাগছে ? প্রশ্নটার ধরনে তার এতটাই বিরক্ত
লাগল যে মুখে প্রায় জোর করে হাসি এনে সে বলল - না না । চলুন !
এইধরনের জায়গায় সে এর আগে কোনদিন আসে নি । ভেতরে বেশ বড় এলাকা জুড়ে বাগান ।
বাগানের মাঝখানে ছোট একটা চার্চ । দুপাশে লম্বা সার সার হোম , চওড়া চওড়া বারান্দা
, কোথাও কোন লোকজনের কোলাহল নেই । বেশ নিরিবিলি । দু একজন সিস্টার যাওয়া আসা করছে
। সেইরকমই একজন সিস্টারের সামনে গিয়ে সে বলল - গুড আফটার নুন !
সিস্টারও সঙ্গে সঙ্গে বললেন , গুড আফটার নুন ।
- সিস্টার আমরা হোম
দেখতে এসেছি । আপনার পারমিশন পাওয়া যাবে ?
- গড অলরেডি আপনাদের
পারমিশন দিয়ে দিয়েছেন । না
হলে এখানে আপনারা এলেন কিভাবে ?
- ওঃ ! থ্যাঙ্ক য়ু
সিস্টার । এই মোমবাতি আগে জ্বালাব ।
- তাহলে ঐ ডান দিকের
সিঁড়ি দিয়ে চার্চের ভেতরে যান ।
চার্চের ভেতরে ঢুকেই জোনাকি তার হাতে একটা মোম ধরিয়ে দিয়ে বলে - জ্বালাও।
পুনরায় তার ‘ তুমিতে ’ অবতরণ ।
-
আমি ? অশোকের স্রেফ মনে হল তাকে নিয়ে কেউ মজা করছে ।
লোডশেডিং হলে বাড়িতে সে নিজের জায়গা ছেড়ে ওঠে না । আলো টালো তাপুই জ্বালায় । সে
বড়জোর মোবাইলটা দিয়ে সাহায্য করে ।
জোনাকি খুব গম্ভীর হয়ে বলে - কেন অসুবিধা
হবে ? তাহলে থাক , বলে আর একমুহুর্ত অপেক্ষা না করে নিজেই মোম দুটো জ্বালাতে শুরু
করে ।
- না তা নয় , বলে অশোক যখন নিজের ভুলটা শুধরে নিতে যায় জোনাকি ততক্ষণে
দুটোই জ্বালিয়ে ফেলেছে । বেশ বুঝতে পারে অশোক প্রবল চেষ্টা করা সত্বেও তার চোখে
মুখে সেই ক্যাবলাটে ভাবটা ফুটে উঠেছে । কি ভীষণ অস্বস্তিকর । সে ভেবে পায় না সে
এখন কি করবে । জোনাকি চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছে । সে একটুক্ষণ ভগবান নামক
বস্তুটার ছবি মনে করতে চেষ্টা করল । যীশুর ক্রুশ বিদ্ধ মুর্তিটায় সে শ্রমিকের ফুলে
ওঠা হাত পায়ের পেশি দেখতে পেল । মন্দির টন্দির সে যায় না । পুজোর সময় বউ ছেলেকে নিয়ে চারদিনই ঘুরতে বেরয় । সে সময়
ট্রাফিকের দিকেই তার নজর থাকে বেশি । চার্চের ভেতরটা খুব ঠান্ডা আর নিস্তব্ধ ।
তারা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই । নিষ্কম্প মোমবাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে
সে স্মার্ট হতে চেষ্টা করল কিন্তু তার বদলে তার চেহারায় ভেসে উঠল নির্লিপ্তি । এই
সময় তাকে কেমন দেখতে লাগে সে জানে না ।
- বিস্কুটগুলো এখানে দেব
সিস্টার ?
- ঐ টেবিলে
রাখুন। এরা সবাই টিবি
রোগী । একটু আগেই এদের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। আপনারা
আর কোথাও যাবেন ?
জোনাকি বলল - বাচ্ছারা
কোথায় আছে সিস্টার ? আমরা ওদের সঙ্গে একটু সময় কাটাব ।
এতগুলো টিবি রোগীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে অশোকের হঠাৎ গা গুলোতে শুরু করল । তার
মনে হল কোন অজুহাতে সে বেরিয়ে যাবে । কে জানে বাচ্ছাগুলোর অবস্থাই বা কেমন ? এইসব
মধ্যবিত্ত ভালবাসা তার চট করে আসেনা ।
- বৌদি
বাচ্ছাদের ঘরে যাবেন তো সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন । একজন আয়া তাদের সামনে এসে
দাঁড়ায় । অশোক দু পা পিছিয়ে আসে । জোনাকি
তাকে জিজ্ঞাসা করে , তুমি হাত ধোবে না ?
বাচ্ছাদের ঘরটা আয়তনে বিশাল । দুর্গা, টুসু হেমব্রম, জয়ন্তী পাখিরারা তাদের দিকে চোখ বড় বড়
করে তাকিয়ে থাকে । অদ্ভূতভাবে
জোনাকি বাচ্ছাগুলোর সঙ্গে মিশে যায় । কোলে নেয়, আদর করে তারপর অশোকের
দিকে ফিরে বলে - কৈ এবার
তোমার গল্প শুরু করো ।
ফেরবার সময় জোনাকি তাকে বলল বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিতে । অশোক হাল্কা হেসে
বলল , কেন বাড়িতে ছেড়ে দিই ।
-
না আমি কারুর লেজুড় হতে পছন্দ করি না । আসবার সময় বিশেষ তাড়া ছিল , এখন নেই ।
অশোক আর কথা না বাড়িয়ে তাকে বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে দেয় ।

Comments
Post a Comment