১। ভার্চুয়াল পৃথিবী .........।।
দ্বিতীয় জীবন কি একটা ভার্চুয়াল পৃথিবী ?
যে পৃথিবীর বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই । অথচ বাস্তব প্রায়শই যাকে ঘিরে
আবর্তিত হয় । এই পৃথিবীর আলো অন্ধকার আমাদের জীবনে আশা নিরাশা নিয়ে আসে । বুকের
মধ্যে দমবন্ধ আনন্দ বা চাপা দীর্ঘশ্বাস । অথচ
একে আমরা ছুঁতে পারি না । স্পর্শহীন এক সম্ভাবনা । তাই কি দ্বিতীয় জীবন ? এই জীবনের জন্য
লালায়িত হয় মানুষ ? যেখানে সম্পর্কহীন সম্পর্ক , বোধহীন বোধ , অনুভূতিহীন অনুভূতি
, যাকে প্রত্যক্ষ করা যায় না তার প্রত্যক্ষরূপ ।
অশোক ভাবে তার জীবনটা দ্বিতীয় জীবন ? প্রথম জীবন থেকে বদলে যাওয়া এক যাত্রা
? বেদ কাকে দ্বিজ বলেছে ? যার দ্বিতীয় বার জন্ম হয় ? তার মনে পড়ে কয়েকদিন আগে শোনা বাউল গানের কথা - রূপ
নিতে সাধ হলো বলে,
আমার রূপে তুমি হলে।
বৈদিক সংস্কৃতিতে সবাইকে শুদ্র হিসেবে ধরা হয় । এরপর শিক্ষা দ্বারা একজন পরিণত হন বৈশ্য , ক্ষত্রিয় বা ব্রাহ্মণে । শিক্ষা মানুষকে নিয়ে যেত
দ্বিতীয় জন্মে । মানুষ দ্বিজ হত । আবার অশিক্ষা তাকে পাল্টে দিত শুদ্রে । ঋষি
ঐতরেয় দাসীপুত্র । কিন্তু শিক্ষা তাঁকে পরিবর্তিত করে বাহ্মণে । তিনি লেখেন ঐতরেয়
ব্রাহ্মণ । আবার প্রীষধ রাজপুত্র ,
যিনি পরে হন শুদ্র । রাজা নেদিস্থের পুত্র হয়ে যান বৈশ্য। ঋষি পুলস্তের ছেলে হন রাক্ষস ।
এইভাবে মানুষ থেকে রাক্ষস , ভগবানের মুখ
থেকে ভগবানের পায়ে পরিবর্তিত হওয়াটা কি দ্বিতীয় জীবন ?
ছোটবেলায় পচা পুকুরের পাড়ে হেলে
থাকা বাবলা গাছ থেকে ছোটছোট ডাল ভেঙে আনত অশোক । যে ডালে ঝুলে থাকত ছোট্ট ছোট্ট
হরেক রঙের গুটি । সেই গুটি গোয়ালঘরের পাশে বেঁধে রাখত সুতো দিয়ে । এরকম অসংখ্য গুটি কেটে বেরিয়ে আসত প্রজাপতি । সে এক
অদ্ভূত উত্তেজনা । সকালের লেখাপড়া
বন্ধ । স্কুলে যাওয়ার জন্য স্নান করতে যাবার আগেও দেখত ডিমের রঙ সবুজ
থেকে বদলে যাচ্ছে । আস্তে আস্তে হলুদ, কালো । সে থমকে যেত । তারপর ডিমের
ঠিক নীচটাতে একটা ছোট্ট ফুটো । প্রথমে বেরিয়ে আসত মুখ, শুঁড়, আর একটু একটু করে সমস্ত শরীর । এরপর
প্রজাপতিটা ডিমের ওপর বসেই বিশ্রাম নিত , চাটত সামনের পা দুটো । আর তার ডানাটা অল্পঅল্প করে বড় হতে থাকত ।
এরপর হঠাৎ দেখা যেত প্রজাপতিটা আর নেই । উড়ে গেছে । পড়ে আছে ডিমের শূণ্য খোসাটা । বিবর্ণ । দেখতে দেখতে স্কুলের দেরী হয়ে যেত । তখনই সে
জেনেছে একটা শুঁয়োপোঁকার দ্বিতীয় জীবন আছে তা হল প্রজাপতি । যার কাজ ফুলে ফুলে মধু
খেয়ে বেড়ান । আর হঠাৎ হাওয়ায় নিজেকে গা ভাসিয়ে দেওয়া । পরাগ মিলন ।
আরো বড় হয়ে সে পড়েছে নিউক্লিয়ার ফিশন আর ফিউশন । দুটো হাইড্রোজেন পরমানুর জমাট বাঁধা ফিশনে তৈরী হয় হিলিয়াম, একটা ইউরেনিয়াম ভেঙে তৈরী হয় সীসা সাথে প্রচুর প্রচুর শক্তি যা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে
খাক করে দিতে পারে মানুষের আত্মা, মানুষের
প্রাণ, মানুষের সৃষ্টি । ভেঙেচুরে যায় অবয়ব; নির্মাণ, সৃষ্টি । আকাশ, আকাশের
সূর্য্য-তারা সব রসাতলে যায় । এটাও কি দ্বিতীয় জীবন ? অশোক ভাবে
এমনি করে সবারই কি একটা দ্বিতীয় জীবন আছে ? যে জীবনের অর্থ, আকাঙ্খা, তৃষ্ণা সবই আলাদা । জেকিল আর হাইডের মত নয় । আরও
সমৃদ্ধ । অথবা অনেকটা পথ উজানে এসে নদী যেমন মিশে যায় সমুদ্রের বুকে । তখন আর
আলাদা করে বোঝা যায় না কোনটা নদী, কোনটা তার জলের মিষ্টি স্বাদ । তখন সবই লবণাক্ত
। জীবনের স্বাদহীন ।
দ্বিতীয় জীবন এক একজনের এক একরকম । কেউ ইচ্ছে করে চলে আসে সেখানে, কেউ না বুঝে
শুধুমাত্র স্রোতে পা মিলিয়ে । কিন্তু
একবার সেখানে এলে আর ফিরে যাওয়া যায় না । প্রথম জীবনের সুদূর ইতিহাস শুধু মনের
গভীরে দীর্ঘশ্বাসের জন্ম দেয় । মোহনা
থেকে পাহাড়, এতটা পথ উজিয়ে আর কেউই পৌঁছাতে পারে না উৎসে ।
দুর্গাপুর ব্যারেজ পেরিয়ে যে রাস্তা সোজা চলে গেছে বড়জোড়ার দিকে সেই রাস্তার মাঝামাঝি তারা সিং ব্রীজ
। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে এক বিকেলে জোনাকি বলেছিল - আমি ঐ পাহাড়ে
উঠব । বাঁদিকে ট্রান্স-দামোদর কয়লা
খনি, ওপেন কাস্ট
মাইনস্ । কোথাও মাটির
পাহাড়, কোথাওবা বিশাল এলাকা জুড়ে চওড়া গর্ত । সেই সব গর্তে পারমানেন্ট জল জমে আছে । পাইপ লাইনে করে পাম্পিং হচ্ছে জল । ওরই মাঝখানে কোন একটা মাটির
ঢিবির গায়ে একটি মন্দির, চুড়োয় তেকোনা পতাকা, রোদে জলে ঝাপসা । বড়ই বিষন্ন চিত্র ।
চলমান ড্রোজার ডম্পার, কয়েকটা এক্সাভেটার । যে যার কাজ করে যাচ্ছে
। তারা যেখানটা এসে দাঁড়াল, সেখানে কাঁটাতারের বেড়া । বরাবর পুরো এলাকাটকে বেড়
দিয়ে রেখেছে । জোনাকি তার
হাতটা ধরে বাচ্ছা ছেলের মত লাফাতে লাগল । - দেখ দেখ কি সুন্দর ? মাটির রঙ এক একটা স্তরে কেমন আলাদা ।
অশোক এতটা আনন্দ পেল কি না বোঝা যায় না । কিন্তু উত্তেজনাটা ওর মধ্যে প্রবল
ভাবে কাজ করল । জোনাকি বলে - ঐ কয়লাগুলো কি সত্যি একসময় গাছ ছিল ? কয়েক
লক্ষ বছর আগে দাবানলে পুড়ে যেতে পারে নি বলে নিজেকে বদলে নিল কয়লায় ? আর এইসব কয়লা
দিয়েই তোমরা বিদ্যুৎ তৈরী করো
?
এইরকম পরিস্থিতে প্রায় সব পুরুষ মানুষই একটা সিগারেট ধরায় । কিন্তু অশোক
ধরাল না । কারণ সে সিগারেট
খায় না । বলল - না হে , বিদ্যুৎ তৈরী অত সহজ নয় । ঐ কয়লা প্রথমে ট্রেনে চাপবে । এরপর এক একটা ওয়াগনকে ওয়াগন-টিপলারে ধরে লাইন
সমেত উপুড় করা হবে ।
বেল্ট দিয়ে যা পৌঁছে যাবে ক্রাসার হাউস ।
যেখান থেকে ছোট টুকরো হয়ে আসবে
কোলমিলে । সেখানে গুঁড়ো হবে । এরপর ফার্ণেস ।
জোনাকি বলল - পুড়তে গেলেও এত জ্বালা ? নিজেকে এত ভাঙতে
হয় ? টুকরো করতে হয় ? এত টুকরো না হলে কি হত গোঁসাই ?
- যত ভাঙবে , যত টুকরো
হবে , পোড়া তত পরিপূর্ণ হবে ।
- ফার্ণেসে দিলেই পুড়ে
গেল ?
- না । সবাই সমান পুড়তে
পারে না । সময় লাগে , তাপমাত্রা
লাগে আর লাগে নিজের ভেতরের
এক উথাল পাথাল ঝড় । টাইম, টেম্পারেচার আর টারবুলেন্স । যত সময় ধরে পুড়বে পোড়া তত সম্পুর্ণ
হবে । আনবার্ন্ট থাকবেনা । কয়লার গুঁড়ো তখন সোনার বরণ ।
জোনাকি হঠাৎ উদাস হয় । - সে জীবন বোধহয় দুর্দান্ত সুন্দর । শুধু জ্বলে
যাওয়া । খনির বুকের কয়লা ভাবতেই পারে না সেই জীবনের কথা । এই চরম জীবনের কথা একমাত্র পুড়তে পুড়তেই জানা যায়।
-
সেই আগুন পোড়া কয়লাই জলকে আঁচে সেদ্ধ করে । টিউবের মধ্যে
দিয়ে জল যেতে যেতেই বাষ্প হয়ে যায় ।
জোনাকি বলল - কয়লা তো নিজে
পুড়লই আবার বদলে দিল শান্ত জলটাকেও ? এরপর ?
- সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরালো , ওর সঙ্গেই তো জুড়ে থাকে
জেনারেটারের ভাগ্য । তার থেমে থাকা স্টেটরে থাকে প্যাঁচানো তার আর টারবাইন যে রোটরটাকে ঘোরাচ্ছে সেটা ম্যাগনেটিক। রোটরের ঘুর্ণনে তারের কুন্ডলির মধ্যে
তারপর আবেশ তৈরী হয় ।
জোনাকি উদাস স্বরে বলল - যেমন আমরা আবিষ্ট হচ্ছি ।
কোজাগরীর পুর্ণিমার চাঁদ তখন আকাশে । পূর্ণগ্রাস হবে আর একটু পরেই , সেদিকে তাকিয়ে অশোক বলল - ফেরাডে সাহেব তেমনই বলেছেন ।
জোনাকি হঠাৎ বলে উঠল - আমি ঐ পাহাড়টায় উঠবো । চল ।
- শাড়ি পরে ?
জোনাকি একবার তাকাল, তারপর পাশের
পাহাড়টার ওপর উঠতে শুরু করল । বলল - এইমাত্র এটার
নাম হল মাউন্ট অশোক , এর ওপরে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কবিতা পড়ব । রবীন্দ্র গুহ ।
ডিউটিরত সিকিউরিটি বলল - বৌদি ওখানে সব বাইরের কাজ সারতে আসে , খুব
নোংরা ।
মাটির এই ঢিবিটার গায়ে ছোট ছোট কাঁটা গাছ । ঘাস প্রায় নেইই শুধু ভিজে
জায়গাগুলোর ওপর ডাম্পারএর চাকার বিনুনীর মত চওড়া দাগ । কয়েকটা জায়গায় মাটি এত
ঝুরঝুরে যে পা হড়কে যায় । অশোক খুব শক্ত
করে জোনাকির হাত চেপে ধরল ।
জীবনকে লিপ্সাবুড়ি
ছুঁয়ে গেল যেন
এখন বুকের মধ্যে দশ
ক্রোশ মরু মাঠ
প্রচুর জরুরী কথা ভয়
বিস্ময় ভ্রম জলের সঙ্গে ,
আগাছা , জাদুসত্য
কত লোকই তো দেখেছে মঙ্গল কাব্যের
চাঁদ …
খানিকটা ওপরে উঠে দম নিল দুজনে । দুজনেই দিকবালিকার মত হাসল । তারপর আরো একটু কাছে
এসে অশোক খুব সন্তর্পনে জোনাকিকে
নিজের বুকের সঙ্গে আলতো জড়িয়ে ধরল ।

Comments
Post a Comment