৮। প্যান
অপটিকান......।।
অশোক একটা
কবিতার বই নিয়ে জানালার পাশে।
গ্রীষ্মকাল । দুর্গাপুরের
আকাশে শুকনো গরম। তাপমাত্রা পঁয়তাল্লিশ ছুঁইছুঁই। বাতাস আর্দ্রতাহীন। কোথাও কোন
আওয়াজ নেই। তার ঘরের জানালার কাঁচের পাল্লা বন্ধ। এমনি গ্রীষ্ম মানায় কিছুক্ষণ
ছাড়াছাড়া কাক ডেকে উঠলে। একটাই কাক। যে একবার ডাকার পর ল্যাম্পপোষ্টে বসে বিশ্রাম
নেবে। অথবা দূর থেকে ভেসে আসবে একটা ফেরিওয়ালার ডাক। মাটি থেকে ওঠা তাপের মত সেই
ডাক ভেঙেভেঙে ধোঁয়ার মত মিশে যাবে বাতাসে।
এখন কোন শব্দ
নেই। শুধু একটা টুনটুনি প্রচণ্ড ব্যাস্ত। আমগাছের গুঁড়ির ওপর এখন ছোটছোট পোকা।
টুনটুনিটা একবার উড়ে একটা পোকা ধরে ডালের ওপর বিশ্রাম নেয়। কবিতার বই কোলের ওপর।
অশোক একমনে পাখিটার ওড়াউড়ি দেখছিল। এমন সময় তার ফোন বেজে ওঠে।
ফোনটা প্রথমে সে
খুঁজে পায় না। দুপুরটা এত নিস্তব্ধ ছিল যে
তার ছায়া, টুনটুনি আর আমগাছ ছাড়া অন্যকিছুর অস্তিত্ব নিজের কাছে ছিল না। এমনকি
মাটিতে পড়া শুকনো আমপাতাগুলোও স্থির হয়ে আছে। ভাঙছে না। অশোক অবাক হয়ে ফোনটা ধরে –
তুমি?
-
আকাশে মন্থর মেঘ, নিরালা দুপুর!
-
এই পুড়ে যাওয়া গরমে তুমি মেঘ দেখতে পাচ্ছ?
-
সে কোন্ পিপাসা কেন্ ব্যাথা তার মনে!
-
কার মনে ব্যাথা? মেঘের না গরমের?
-
ডাহুকীর। জীবনানন্দ দাশ।
-
তুমি এখন কবিতা পড়ছ?
-
গাহে একা নিদ্রাহারা বিরহিণী হিয়া। তুমি কি করছ?
-
একটা ঘননীল রঙের টুনটুনির ওড়ার শব্দ শুনছি।
-
বাহঃ। শোন। আমি তবে রাখি। ফোনটা কেটে যায়।
কান থেকে নীচে
নামিয়ে রাখতে গিয়ে দেখে, পাশে তাপু দাঁড়িয়ে।
চোখে তখনও ঘুম জড়িয়ে। ফোনের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যেতে চলে এসেছে, দুপুর একাকীত্বের যৌথ
নির্জনতার খোঁজে। অশোক ফোনটা রাখতে তাপু তার সামনে থাকা বিছানায় শুয়ে পড়ে। অশোক
বিছানার ওপর থেকে পাটা একপাশে সরিয়ে নেয়।
নিস্তব্ধতাটা
যখন আবার জাঁকিয়ে বসছে তখনই আবার ফোন। অশোক ইতস্তত করে। মুখে একটা লাজুক হাসি ফুটে
ওঠে। বলে – হ্যালো!
-
তোমার বাগানে বেগুন ক্ষেত আছে?
-
মানে?
-
পায়ে বেগুন কাঁটা ফুটলে যদি টুনটুনিটা আমার কাছে আসে?
-
এলে কি হবে?
-
তখন টুনটুনি আমার কাছে আসবে কাঁটা তুলে দিতে । আর আমি কাঁটা তোলার পর সে
ভারি খুসি হয়ে আবার গিয়ে গাইতে লাগবে, টুনটুনা টুন টুনটুন।
ফোনটা কেটে যেতে
অশোকের মুখে লাজুক হাসিটা আলগা ঝুলে রইল। তাপু প্রশ্ন করে – কে?
- জনগন।
তাপুর ভুরু কুঁচকে রইল। - এই দুপুর রোদে যখন সবাই ঘুমচ্ছে, তখন
দেখছি জনগন তোমাকে বেশ খুঁজে পাচ্ছে। তাপু উঠে ড্রয়িং রুমে চলে যায়। হালকা করে
টিভি চালায়। অশোকের মুখ থেকে হাসিটা খসে পড়ে শুকনো পাতাদের ভিড়ে।
জোনাকি একদিন
তাকে বলেছিল - তোমার লেখালেখি, পছন্দ, অপছন্দ এত সবকিছু তাপু জানে?
- কিছু তো অবশ্যই জানবে, এতদিন একসাথে আছি।
- তুমি এমন করে বলছ যেন দুটো অচেনা লোক এক
হোটেলে আছ। খাবার সময় দেখা হয়, মুখচেনা।
- না তা নয়। আসলে আমার লেখলিখি নিয়ে ওর কোন
উৎসাহ নেই।
জোনাকি চোখ কুঁচকে
অশোকের দিকে তাকিয়ে বলেছিল - তুমি আর কতটুকু জান, বোঝ ? আমি জানি তাপুর অবস্থা।
-
তুমি ?
-
হ্যাঁ, আমি। একমাত্র মেয়েরাই মেয়েদের সব কথা বুঝতে পারে।
তোমরা ছেলেরা মেয়েদের কষ্ট বুঝতে পারবে না। তোমরা নিজেদের টুকু বুঝে নিতে পার।
এক্কেবারে হিসেব করে।
-
মানে ?
-
না, কিছু নয়। তুমি তাপুকে আর একটু সময় দাও। সারক্ষণ তো
কারখানায় পড়ে থাক। কতটুকু সময় দাও তুমি বাড়িতে?
অশোক ভাবে আজকাল
ঘরে বাইরে সারাক্ষণই কি ও পর্যবেক্ষণে থাকে ? মাইস্ক্রোস্কপে চুলচেরা ছবি ওঠে?
অশোক যখন বাড়ি ফিরল তখন রাত প্রায় নটা । যদিও তার ফেরার কথা ছিল ছটায় ।
বাড়িতে আজ লেডিস ক্লাবের গেট
টুগেদার ছিল । ওটা তাপুর ক্লাব । মাসে একবার করে কিটি পার্টী। প্রচুর খাওয়া দাওয়া আড্ডা গল্প হৈ চৈ চীৎকার
চেঁচামেচি , কিছু ইন্ডোর গেমস প্রাইজ ইত্যাদি সবই থাকে । অশোকের কাজ শুধু প্রয়োজনের
জিনিষগুলো যোগান দেওয়া । সকালে অফিসে বের হবার আগে এজন্য সে তাপুর হাতে কিছু টাকা দিয়ে বেরিয়েছিল । কিন্তু বাজার এতই
দূরে যে একা তাপুর পক্ষে সব কিনে বাড়ি ফেরা মুশকিল । সামনে বড় রাস্তার ওপরে একটা
মাঝারি সাইজের দোকান আছে ঠিকই , কিন্তু দৈ মিষ্টি কিংবা দুধ মাখন জাতীয় কিছু চট
করে পাওয়া যায় না । সে বাড়ি ফিরে দেখল বাইরের বসার ঘর বিলকুল খালি , ছড়ানো সেন্টার
টেবিল , চেয়ার । অর্থাৎ লেডিস ক্লাব শেষ । তার
মনে হল ক্লাবের আড্ডা যেন বেশি তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে । আরও খানিকক্ষণ চললে তার
পক্ষে বেশ সুবিধা হত । কারও নজর তার দিকে পড়ত না । যে কেউ তাকে কিছু নাকিছু
জিজ্ঞেস করত আর সে যা হোক কিছু একটা উত্তর দিয়ে নিজের ওপর থেকে প্রচন্ড এই মানসিক
চাপটা অল্প হলেও সরিয়ে নিতে পারত । কয়েকদিন ধরে তাপু তাকে প্রচন্ড নজর করছে ,
এমন কি তার শরীরে প্রত্যেকটা অংশকে তাপু খুঁটিয়ে দেখছে । কি রকম করে সে কথা বলছে ,
কেমন করে ভাত খাচ্ছে , এমনকি পুটুটাকে অশোক যখন আদর করছে তখনও । বিশ্ব ব্রহ্মান্ড
উলটে গেলেও আশোক পুটুকে ছাড়া এক মুহূর্ত কিছু
ভাবতে পারে না । যদিও স্কুলের পড়াশোনার চাপে ছেলে খুব বেশিক্ষণ বাবার কাছে থাকতে পারে না ,
তবু অশোক সন্ধ্যেবেলা বাড়ি এসে
আগে ছেলেকে না দেখে ,
একটু কথা না বলে ডিউটির
জুতো জামা কাপড় ছাড়ে না । কি করবে , ছেলের জন্য একটা
বানভাসি তার সবসময়ই রাখা থাকে । আরও একটা দুটো বাচ্ছা হোক সে চেয়েছিল কিন্তু
তাপু রাজী ছিল না ।
সে খুব ব্যস্ত হয়ে পুটুকে বলে - আজ কি কি হল
রে ? তোর মজা হয়েছে ? যদিও মাথায় তার তখনও বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে ।
নিজেকে সে বোঝাচ্ছিল প্রেম জিনিষটা এক হিসেবে খুবই ভাল , যে সব বর্হিলক্ষণ
তার আছে সেখানে জড়িয়ে থাকে সংসার , জড়িয়ে থাকে স্বার্থ । ছোট ছোট বন্ধন। যার দাবী
অনেক । তুচ্ছ ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে আত্মাকে জড়িয়ে ফেলা । তার মনে পড়ল , জোনাকি তাকে চারদিন
আগেও বলেছে , আমার সেন্ড করা এস এম এস গুলো তুমি কিন্তু তোমার মোবাইলে রেখো না ।
কেউ দেখে ফেললে মুশকিল । ঐ এস এম এস গুলো তে সবই কাজের কথাই লেখা আছে , তবু বলেছিল
। মেয়েরা অনেক কিছু আগে থেকে বুঝতে পারে । এতদিন সে পারে নি , মোবাইলে জোনাকির
দুটো এস এম এস থেকে গেছে । আপাত অর্থহীন সেই সব এস এম এস কে বুঝবে তার বোধগম্য হয়
না । তার মাথায় আসে না এখানে বিষয়টা প্রধান নয় , নামটাই সব । একটা নাম বার বার
ঘুরে ফিরে ইনবক্সে , সেন্ট মেলে ড্রাফটের ভাষাতে জড়িয়ে পড়ছে । শুধু নামের পৌনপৌনিক
ব্যবহার , ধারনা , ক্ষোভ , বদ্ধমূল ধারনা
, সন্দেহ , অধিকার বোধ জাগিয়ে
তুলতে পারে । জলের মত ঘুরতে ঘুরতে তা এক গভীর আবর্ত তৈরী করতে পারে যাতে তলিয়ে যেতে
পারে সম্পর্কের বাঁধন , পরিমিতি বোধ , শরীর , সমস্ত শারিরীক দক্ষতা সমূহ ।
অশোক ভাবল বেন্থামের প্যান অপটিকান মডেলের কথা । প্যান মানে সব । আর অপটিকান মানে
নজরদারি । পুরো ব্যাপারটার জন্ম ১৭৮৬ সাল থেকে ৮৭ সালে যখন জেরেমি বেন্থাম তাঁর ভাই স্যামুএলের কাছে রাশিয়া
যান । স্যামুয়েল অর্ধবৃত্তাকারে কারখানা বানান । যেখানে গুটি কয়েক অফিসার পুরো
কারখানার কাজ দেখতে পারে । এই মডেল আরো উন্নত করে জেরেমি বানান জেলখানা । যা হসপিটাল স্কুল
স্যানেটোরিয়াম আস্যাইলামের ডিজাইনেও কাজ করে । গ্রীক উপকথার পুরুষ দৈত্য
প্যানঅপটেক্সের নাম অনুসারে তার নাম দেন প্যান অপটিকান । দৈত্যর মাথায় আছে হাজার
চোখ । ফলে সে খুব ভাল পাহারাদার । বেন্থাম নিজে এই সীস্টেমকে বলেছেন , a new mode of obtaining power of mind over mind , in a
quantity hitherto without example । মনের
ওপর মনের এই দখল নেওয়ার পদ্ধতিটা হল a millita
grinding rogues honest ‘’
এই বিশেষ স্থাপত্যে থাকে বৃত্তাকার ছোট ছোট সার দেওয়া কুঠুরি যার একটা থেকে
আর একটাকে দেখা যায় না । এই কুঠুরিগুলো থেকে বাইরেও দেখা যায় না । এগুলো থাকে বৃত্তের পরিধি বরাবর । বৃত্তের
কেন্দ্রে থেকে নজরদারী করে , একাই । কেন্দ্রের এই কুঠুরি থেকে পরিধির সবকটা কুঠুরি
পরিষ্কার দেখা যায় , কিন্তু পরিধি থেকে এই কেন্দ্রীয় ঘরের ভেতর কিছুই দেখা যায় না
। নজরদারী এখানে দক্ষতার শীর্ষে । বিভিন্ন ধরনের লোক বিভিন্ন কুঠুরিতে । কেউ কারও
সাথে মিশতে পারছে না । যোগাযোগ নেই । চেনে না । জানে না । কিন্তু তারা জানে যে একজন
পাহারাদার তাদের ওপর নজর রাখছে , যদিও একজনের পক্ষে শারিরীক বা মানসিকভাবে তা অসম্ভব । এমনকি পাহারাদার না
থাকলেও তারা জানে ওখানে ভগবানের মত কোন এক সর্ব শক্তিমান পাহারাদার তাদের নজর
রাখছে । এইভাবে নজরদার থাক বা না থাক প্রত্যেকে নিজেই নিজের ওপর নজর রাখবে । কারণ সে জানে সবসময়ই আছে নজরদারীর আওতায় । কোথাও
কোন জোর নেই ।
প্রাচীন
ভারতীয় সমাজবিদরা ঠিক এমনি এক সর্বদর্শী প্যান অপটিকান ভগবান বানিয়েছেন , যিনি ,
পাপ করলে দেখতে পান । আর তার
শাস্তিও দেন । এজন্মে অথবা পরজন্মে ।
নিজের ওপর নজরদারীর জন্য অশোক বেশ কিছুদিন ধরে জোনাকির পাঠানো এস এম এস
গুলো ড্রাফট হিসেবে সেভ করছিল । মোটামুটি চব্বিশ ঘন্টার মত রেখে আবার ডিলিটও করে
দিচ্ছিল । নামটা জোনাকি থেকে শুধু জেড অক্ষর দিয়ে সেভ করা আছে এখন , কিন্তু
নাম্বারটা তো এখন তার পুরো মুখস্থ । সব কিছু ডিলিট করে দিলেও কিছু হবে না ।
জোনাকির মোবাইল নাম্বারটা তার মনে পড়ল, পরপর ডিজিট গুলো । নাম ছাড়া শুধু নাব্মারটা
দিয়ে কল করলে কেমন অর্থহীন হাহাকারের মত
মনে হয় ।
বাথরুম থেকে স্নান করে বের হবার পর তাপু বলল - তুমি চান করতে এত সময় নিলে ? এর মধ্যে জোনাকির
দু দুবার ফোন করা হয়ে গেল !
ধ্বক করে উঠল তার বুক । তাপু কি করে জোনাকি নাম জানল ?
ভিজে চুল মুছতে মুছতে গম্ভীর হয়ে সে বলল - ঠিক আছে , ফোন করে নিচ্ছি ।
এইসব পরিবর্তনের মধ্যে কোন একদিন দুপুরে তার বাড়ীতে লাঞ্চ করতে আসতে দেরী
হয়ে যায় । জেনারেশন কমে গেছিল , ফলে কয়লার সাথে প্রচুর তেল পোড়াতে হয়েছিল । না হলে
উইনিট বন্ধ হয়ে যাবে। অর্ধেক লোড , তার
ওপর প্রচুর দামী তেল । কয়লা গুঁড়ো করে যে পালভারাইজার , তাতে প্রবলেম । সব
ঠিক করে ঘরে এল তিনটে পনেরো । মোবাইলের কথা বেমালুম ভুলে স্নান করতে গেল । জোনাকির
ফোন । বাথরুম থেকে বের হতেই তাপু বলল , সেই জোনাকি নামের মহিলা তোমায় ফোন করেছিলেন
, একবার দেখবে না?’’
তাপু অশোকের নির্লিপ্তি জানে । এই অসুখে সেও সংক্রমিত ।
কোন রকমে ঢোক গিলে অশোক জবাব দেয় , দেখছি ।
Comments
Post a Comment