প্রেম  এবং গল্প.........।।

তাপু খবরের কাগজ পড়ছিল । কাগজে হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে লেখা । সে পড়ছিল প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে মতান্তর হয়েছে ওনার । পড়ল তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী শাওন সম্পর্কে । পড়ল , ‘ খুব কষ্ট হয় । জীবনে যা চেয়েছি তার অনেকটাই পেয়েছি । এই চাইতে গিয়ে কত কিছু যে হারাতে হয়েছে ! আমৃত্যু এই কাঁটা বিঁধতে থাকে । ’  এই হারানোগুলো অবশ্যই প্রথম জীবনের। যা হারিয়ে যায় তা অতীত।
সে মনে মনে অশোককে বলে তুমি একটা পেতে চাইলে আর একটা তোমায় হারাতে হবে । জীবন এইরকমই । খুব ছোট্ট তার আশা । সুখী সংসারের বাইরে আর অন্য কিছু নয় একটা সম্পর্কের জলে জড়িয়ে গেলে অন্যটা নিজে থেকেই শুকিয়ে যাবে । তার কান্না পায় । ভাবে এর সমাধান কি ? কাউকে সে একথা বলতে পারে না । বুড়ো বাবাকে বললে তিনি মারা যেতে পারেন । দু বছর আগে একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে , এখন একটাদিক প্যারালিসিস । মেয়ের জীবনের এতটা চাপ নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় তাপু ভাবল ব্যাপারটা অশোকের দিদিকে জানাবে । বলবে , তুমি ছাড়া আর কাকে বলব ? সারাদিন প্রায় একাই বাড়ীতে থাকি । অফিসের চাপ ওর সবসময় , কথা বলার এমনিতেই সময় নেই । এখন আবার এই অবস্থা ।
দিদি কিছু বুঝতে পারে না , বলে , হ্যাঁ ও তো চিরকাল এইরকমই গোঁয়ার । কারো কথা কোন দিন শোনেনি । বাবার কথা তো কোনদিন শোনেনি ! ছোটবেলায় কত যে এইজন্য মারধোর খেয়েছে ! এক , মা যদি পিঠে হাত বুলিয়ে কিছু বলত তবেই শুনত ।
এমনি করে গল্পে গল্পে তাপুর আর আসল কথাটা কাউকে বলাই হয়ে ওঠেনি । তাছাড়া বলবেটাই বা কি ? নোংরা ছুঁড়লে কিছুটা নিজের গায়ে এসে লাগবেই । আর এ শহরে তার এমন কেউ বন্ধু নেই যাকে সে সব খুলে বলতে পারে , পরামর্শ নিতে পারেঅশোক তার স্বামী , অশোকের বদনাম হলে তার যে খুব খারাপ লাগবে এটা সে কি করে অশোককে বোঝাবে ?
অশোককে সে জিজ্ঞাসা করেছিল - তোমার জীবনের উদ্দেশ্য কি ?
অশোক বলেছিল - দুটো উপন্যাস , দুটো ছোটগল্পের বই, দুটো কবিতা আর দুটো প্রবন্ধের
- উপন্যাস লেখা শুরু হয়েছে ?
- উপাদান খুঁজছি । জীবনের অভিজ্ঞতা ছাড়া কি কোন লেখা হয় ?
- এখন উপাদান খুঁজছ ?
অশোক বুঝতে পারে তাপুর একথা বলার মানে কোন বাঁকা ঈঙ্গিত আছে
তাপুর মনে পড়ল রামকিঙ্কর বেজের লেখা কিছুদিন আগে পড়েছিল সে তিনি লিখেছিলেন , জীবনে নারীর প্রয়োজন আছে বৈকি ! নিশ্চই আছে । সৃষ্টির আসল লীলা তো পুরুষ প্রকৃতির লীলা । জীবনে অনেক নারীই এসেছে । কেউ এসেছে দেহ নিয়ে , কেউ এসেছে সাময়িক তীব্র আকর্ষণ নিয়ে । কাউকে ছাড়িনি । ধরেছি , হজম করেছি । হজম করার মানে তোমরা বুঝবে না । ব্যাপারটা ভীষণ কঠিন
তাপু জিজ্ঞাসা করল , অভিজ্ঞতা তোমার হজম হচ্ছে ?
অশোক ধ্বন্ধে থাকে । তাপু কোনদিকে এগোতে চায় ঠিক বুঝতে পারে না । অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মানে সে বোঝে কিন্তু অভিজ্ঞতা হজমের মানে তার জানা নেই
-      আচ্ছ তোমার কি মনে হয় কেউ একটা উপন্যাস লিখে তারপর মারা গেছে ?
অশোক একটু ভাবল । বলল,  রাঁবোর  নাম শুনেছো ? নরকে এক ঋতু , ওনার বিখ্যাত কবিতার বই । সাঁইত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন । সতেরো থেকে কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত লেখালেখি । তারপর যুদ্ধ , পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন
- বিদেশী লেখকদের কথা জেনে আমি কি করব ? বাংলায় যারা লিখেছেন তাদের ব্যাপারে জানা থাকলে বল
- অদ্বৈত মল্লবর্মন , তিতাস একটি নদীর নাম , উপন্যাস লিখেছিলেন । সাঁইত্রিশে মারা গেছেজীবনানন্দ বেঁচে থাকতে কটা লেখা ছাপা হয়েছে ? মারা গেছিলেন ট্রামের ধাক্কায়
- তুমি বললে তুমি দুটো উপন্যাস লিখতে চাও
- হ্যাঁ
- আগে জানলে তোমাকে বিয়ে করতাম না
- মানে কত আগে ?
- বিয়ের আগে ! তখন তো বুঝিনি লেখক মানে কি জিনিষ ? আচ্ছা, তোমার এবারের অভিজ্ঞতা তো দামোদরের ধারে হল !
ভীষণ চমকে ওঠে অশোক । তাপু তাকে কোনদিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে বুতে পারে না । তাপু কোনদিকে ঈঙ্গিত করতে করতে নিজের বক্তব্য বুনে চলেছে জানে না । তবে তাপুর মনে বিশেষ কোন প্লট ভরা আছে একথা সে এবারে বুঝতে পারে
-      আচ্ছা এর পরের উপন্যাসটা কোথায় হবে ?
অশোকের মনে পড়ল জোনাকির কথা । জোনাকি তাকে একদিন বলেছিল - তোমাকে নিয়ে যাব প্লাতা নদীর ধারে
এমন অদ্ভূ কথা শুনে অশোক প্রথমটা হকচকিয়ে গিয়েছিল । তারপর তার মনে পড়ে প্লাতা আর্জেন্টিনার একটা নদী সেই যেখানে অসুস্থ কবিকে নিয়ে গিয়ে রেখেছিলেন ভিক্টোরিয়া । গোটা একটা বাড়িই ব্যবহার করা হত কবির জন্য , প্লাতার কিনারে । সে ঈঙ্গিতপূর্ণ ভাবে হেসে বলল , কিন্তু আমাকে নিয়ে গেলেও নিজে তো তুমি জলে নামতে পারবে না !
জোনাকি সাথে সাথে বুঝল সাতুড়ির দিকে যেতে রানীগঞ্জ পার হয়ে দামোদরের একদম কিনারায় তারা যেদিন চলে গিয়েছিল । জায়গাটার নাম মেজিয়া ঘাট। প্রথমে তারা বাইকটাকে নতুন যে কন্সট্রাকশন হচ্ছে সেখানে রাখে । বাইক থেকে নামতে গিয়ে সেফটি শু সহ অশোকের একটা পা জোনাকির গায়ে লেগে যায় । থতমত খেয়ে যায় অশোক । সামলে নেয় জোনাকি । কয়েকজন স্থানীয় ছেলে সেখানে দাঁড়িয়েছিল তখন , তাদের লক্ষ্য করে ছেলেগুলো বলেছিল - আমরা দাদা একটু পরেই এখান থেকে চলে যাব । বাইকটা আপনারা নদীর কাছেই রাখুন !
শুনে তারা সব শুদ্ধ নদীর ধারেই চলে আসে । সেখানে তখন পাম্প করে বালি তোলা হচ্ছে । বালির মাঝখানে একটা আধবয়সী লোক পা ছড়িয়ে বসে , সঙ্গে একটা কুকুর । ছবিটা দেখে অশোকের তাৎক্ষণিক মনে হল তারা বুঝি উদ্ধরনপুর ঘাটে এসে হাজির হয়েছে । কুকুর আর মানুষ তাদের দুজনকে দেখেও নির্লিপ্ত থাকে । তারা বালির পার ধরে জলের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ায় । অনেকটা দূরে নদীর ওপরে রেল ব্রীজ । তার ফাঁকে অস্তগামী লাল সূর্য । সে দেখল বালির ওপরে হাতের ছোট ব্যাগটা নামিয়ে রেখে জোনাকি নেমে যাচ্ছে নদীর ভেতরে । দেখা মাত্রই সে চেঁচিয়ে ওঠে , এই ! শাড়ি ভিজে যাবে !
- তা আমি কি করব?
-এ কটু উঁচু করে তুলে নিলেই হয় !
- বাঃ বেশ মজা ! আমি উঁচু করে শাড়ি তুলি আর তুমি আমার অর্ধেক পা দেখে নাও !
- আমি নই ! জল দেখবে !
- জল দেখবে , মাছ দেখবে , বালি দেখবে আর তুমি ?  তার চেয়ে যেমন ভিজছে ভিজুক
সে জোরে চেঁচায় - আরে কি মুশকিল ! আর দূরে যেও না ! কোথায় চোরাবালি রয়েছে তার নেই ঠিক !
হাঁটু জলে অক্লেশে হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় জোনাকি - কেন আমি ডুবে গেলে তুমি আমাকে বাঁচাতে আসবে না ?
-      ওরে বাবা অত দূর আমি ভাবতেও পারছি না ! তুমি উঠে এসো !
চারিদিক বেশ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে । অল্প দূরে জলের মধ্যে আলো বুজকুরি কাটছে । পা থেকে সেফটি শু খুলে এবার সে জোনাকিকে ধরে আনার জন্য জলে নামার তোজো করে । চেঁচায় , আর যেও না প্লিজ !
জলে নামলে তার প্যান্ট ভিজে যাবে , ভিজে গেলে জোনাকির শাড়ির মত অত তাড়াতাড়ি শুকোবেও না , এই ভিজে প্যান্ট দেখে তাপু কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে তাকে , তার আগে অফিসে কেউ কিছু বলতে পারে ! বাড়ি ফেরার আগে একবার কিছুক্ষণের জন্য তাকে অফিস যেতে হবে । সে জোনাকিকে  আবার কাতর অনুরোধ করে - প্লিজ এদিকে চলে এস এবার !
একটু পেছিয়ে আসে জোনাকি । বলে - এখানে কোথাও চোরা স্রোত নেই , তুমি দেখো !
জোনাকির কথা পুরো শেষ হওয়ার আগেই অশোক গিয়ে দাঁড়ায় তার মুখোমুখি । এবং অদ্ভূ এক কারণে দুজনেই চুপ হয়ে যায় । এখান থেকে চারপাশের পৃথিবীটা একেবারে অন্য রকমের দেখাচ্ছে । শুধু নদীর জলের শব্দ ছাড়া আর সবকিছু নির্বাক । পূর্বাপর কোন কারণ ছাড়াই অশোক নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনে জোনাকির ঠোঁটের ওপর । কয়েকটা মুহুর্তেরই তো ব্যাপার । তবু তারা দুজনেই খুব ভাল আচর করেকেউ একটুও কাঁপল না , দ্বিধা করল না এমনকি ভুলও না । জলের ভেতরে দুজনেরই পায়ের নীচে বালি সরে যাচ্ছে স্রোতের সঙ্গে , কিন্তু থরোথরো আশ্লেষ তাদের ধরে রেখেছে শক্ত করে
জল থেকে উঠে তারা দুজনে চুপ করে থাকতে পারত, কিন্তু খুব কেজো গলায় জোনাকি তাকে বলল , আর একটা কাজ করতে হবে । জলে একবার হাতটা ধুয়ে নাও এখন ।
- কেন ?
- আমি বলছি তাই !
বাধ্য ছেলের মত অশোক একটু নীচু হয়ে নদীর জলে হাত ধোয় । তার দিকে জোনাকি একটা টিফিন বক্স এগিয়ে ধরে । বলে , এগলো এবার খেয়ে নাও
- এখানে কি এনেছ ?
- বক্স খোলো , খুললেই দেখতে পাবে । দুপুরে তৈরী করেছিলাম , ঠান্ডা হয়ে গেছে এখন । অতটা ভাল আর লাগবে না
অশোক ভাবে মেয়েদের এই এক সুবিধা । তার মধ্যে যে চির পুরুষটি জোনাকিকে জড়িয়ে ধরেছিল , হাতে খাবার দিয়ে কেমন এক লহমায় তাকে শান্ত করে দিল । নিঁখত সময় জ্ঞান । আগেও নয় , পরেও নয় । ঠিক যখন অশোকের মধ্যে ইচ্ছেটা ডানা তখনও বন্ধ করেনি , ঠিক তখনি ।
আস্তে করে জোনাকি তাকে বলল , আমার ভীতু বন্ধু !
অশোক খুব শান্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল
আজ যখন জলে নামার কথা উঠল , জোনাকি এখন প্রশ্ন করল , কেন ? আমি কেন জলে নামতে পারব না ? তুমি ভীতু , নামতে তুমিই পারবে না ।
-      বেশ । আমি তো ভীতুই , অস্বীকার কে করছে ? কিন্তু তুমি জলে নামলে তোমাকে তুলে আনতে যাবে কে ? আমিই তো ? ওতে আমার কোন আপত্তি নেই । বরং আমি খুব অপেক্ষায় আছি এখন থেকে ......
জোনাকি অশোকের ঈঙ্গিত বুঝতে পারে । তার মুখ লাল হয়ে যায় । বুঝতে পেরে অশোক বলে , আমার প্লাতা নদীর ধারে গিয়ে আর কাজ নেই ।
জোনাকি উত্তর দেয় , ঐ যত্নটুকু না হলে কি করে তোমার কবিতা হবে ? উপন্যাসই বা কি করে হবে ?
- কোথায় ? প্লাতার ধারে ?
- না গো নিখিলেশ ! দামোদরের ধারেই আমার আর একটা বাড়ী আছে । মাঝে মাঝে যাই , একদম নিজের বাড়ী ।
- কোথায় ?
- আমাদের গ্রামের বাড়ী , ঝাড়খণ্ডের কাছে। আমরা তো ঐখানকারই লোক । ওখানে আমাদের সবই আছে । গিয়ে থাকলেই হল । দামোদরের উৎস দেখিয়ে আনতে পারব
অশোক ভাবল হুমায়ুন আহমেদের কথা । কিছু চাওয়া আর কিছু হারানো । তাই তাপু যখন বলে দামোদরের ধারে অভিজ্ঞতা তো হল , এর পরের উপন্যাসটা কোথায় হবে , অশোকের মনের মধ্যে গাঢ় একটা বেদনা দলা পাকিয়ে ওঠে । এই কথাটা তাপু ইচ্ছা করেই বলল, না এমনি বলল বুঝে উঠতে পারে না । পরপর এতগুলো ঈঙ্গিত তাপু কেন তাকে দিচ্ছে ? উপন্যাস লিখলে কি আনন্দ পাওয়া যায় ? না শুধুমাত্র যন্ত্রণা জোনাকি তাকে বলেছিল , যাইই লেখো , তার মধ্যে একটা অহৈতুকী আনন্দ লুকিয়ে আছে জানবে । লেখার শেষে সেটা বুকের ভেতরে বাজতে থাকে । অথচ অশোক দেখেছে যতই লিখছে ততই জমাট বাঁধছে বেদনা প্রথম ফাল্গুনের কুয়াশার মত তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে যন্ত্রণা
মরিয়া হয়ে তাপুর প্রশ্নের জবাবে সে বলে , পরেরটা প্লাতা নদীর ধারে কন্ঠস্বরে তার বেজে উঠল চরম উদাসীনতা ।
বেশ ধাক্কা খেল তাপু । একটু পেছিয়ে বসল সে । বলে - তাই তো একা দামোদর তোমাকে কি করেই বা খুশী করবে ?
এরপর দুজনেই চুপ । দুজনেই অপেক্ষা করে কে আগে কি কথা বলবে
তাপুই বলল - আচ্ছা দুয়ের বেশি উপন্যাস কে লিখেছে ?
-      অনেকেই লিখেছেরবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে কার কার নাম বলব ? সুনীল গাঙ্গুলী , হুমায়ুন আহমেদ ...
কথার মাঝে বাধা দিয়ে তাপু প্রায় খেঁকিয়ে উঠে বলে - ওঁরা সবাই কোন নদীর ধারে গিয়ে অভিজ্ঞতা তুলে এনেছিলেন ?
-      সারা পৃথিবী জুড়েই নদী আর ওরা কখনই এক জায়গায় বন্দী হয়ে থাকেন নি । সব নদীই ওঁদের জীবনে সত্যি ।
তাপু জ্বলে উঠে বলে - আমরা মধ্যবিত্ত । আমাদের জীবন কি আর ওদের মত ?
অশোক বলে - কেন পেন্ডুলামের মত ঝুলে থাকা স্থির জীবন কি খুব ভাল ? নড়তে চড়তে হবেই । এদিক থেকে ওদিক । তবেই তো সৃষ্টি হবে । জীবনের দুটো চরম প্রান্তে ঝুলতে হবে । না হলে লেখক কি করে নতুন লেখা লিখবে ? থেমে গেলে লেখক মরে যাবে ...., ’ বলতে বলতে দেখে তাপু অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে , শুনছেই না তার কথা । অশোকের মনে পড়ে যায় জোনাকির কথা । জোনাকি তাকে বলেছিল , চরম নিয়ে মানুষ কখনো বাঁচতে পারে না । অথচ চরম ঘটনা কার জীবনেই না ঘটে ? ভগবান তথাগত এজন্য মানুষকে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে বলেছেন । নিজে তিনি রাজা হতে পারতেন । কিন্তু সে সব ছেড়ে এক রাত্রে চলে গেলেন অনিশ্চিতের জীবনে । সেখানে দুঃখ কষ্ট যন্ত্রনা একাকীত্ব ছাড়াও ছিল অজস্র মারী যারা নিরন্তর ভয় দেখায় । এরা সসময় তীব্রভাবে ডাকে , বলে , এস । এখানে উঠে এস । এখানে এই প্রান্তে জীবন আছে , নেশা , ভোগ , যৌনতা , সেবা , সুখ সব আছে । এখানেই সব । চলে এস । সেসব ছেড়ে তিনি বেছে নিলেন ভিন্ন প্রান্তের জীবন কিন্তু সেখানেই তিনি আটকে থাকেন নি । ফিরে এসেছেন সেখান থেকে । বেছে নিয়েছেন অন্য জীবন , তবে পূর্ব জীবন নয় সেটা । চরম ভোগ বা চরম ত্যাগ দুটোই তিনি বাদ দিয়েছেন । মানুষ যাতে ছোট পাওয়াকে মুল্য দিতে শেখে সেজন্য বলেছেন , মঝঝিম পন্থা । অর্থাৎ মাঝখান দিয়ে চল ।
অশোক ভাবে প্রান্তিকতা যে ক্যাওসের সৃষ্টি করে সাধার মানুষকে তা পুড়িয়ে দিতে পারে । যে পুড়ল না সেই অসাধারঅবশ্য শুধু পুড়ে না যাওয়াটা অসাধারণত্ব হতে পারে না । পুড়ে না গিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করাই অসাধারণত্ব । লুকিয়ে প্রান্তিকতায় স্নান , আবার ফিরে এসে সাধার হয়ে যাওয়া , এতো প্রায় ছদ্মবেশ ধারনের মত । সুখ আছে ক্ষণিকের । এবার সেই সুখকে দীরঘস্থায়ী করার জন্য সৃষ্টিতে ডুবে থাকা ।
তাপু তার কথা অর্ধেক শোনে । গম্ভীর হয়ে বলে - তুমি রামকিঙ্কর বেজের বইটা এনেছিলে , ভুলে গেছ সেটা, না ?
- ওঃ পড়া হয়ে ওঠেনি । পড়ব ঠিক ।
- তাই ? তাই বুঝি ঐ বইটা এখন আমার টেবিলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ! বইটা আগে আমি পড়ি তুমি সেইটাই চাও আমি ঠিক জানি !
ঈঙ্গিতটা না বোঝার মত বোকা নয় অশোক । তাপুর কথার মানে এই যে অশোক বইটা ইচ্ছে করেই তাপুর টেবিলে রেখে দিয়েছে । তাপু যাতে বইটা পড়ে আর খানিকটা নিজে বুঝে নেয় । কথার মাঝে তাপু দুম করে উঠে গিয়ে ওঘর থেকে রামকিঙ্করের বইটা এনে অশোকের হাতে ধরিয়ে দিলমাঝের পাতা একটা সামনে খোলা , তাতে লেখা , একজন শিল্পীর মৃত্যু পর্যন্তই ভালোবাসার আকাঙ্খা থেকে থেকে যায় । সবকিছুর মধ্যেই সেক্স থাকে । সেক্স ছাড়া সবই অসাড় , প্রাণহীন প্রাচীন ও মধ্যযুগের  মহান শিল্পীরা মনে রাখার মত বিখ্যাত সব কাজ করে গেছেন । যেহেতু তাঁরা কোনরকম যৌন বিধিনিষেধ বা সেক্সুয়াল ইনহিবিশন ও মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন না , সৃষ্টির মধ্যে চিরন্তন মানবের চিত্তকে অসাধার সৌন্দর্য্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন । আমি শিল্পীর স্বাধ্বীনতায় বিশ্বাস করি , প্রেম এসেছে জীবনে । সেক্সুয়াল রিলেশনও হয়েছে , যা কখনই বলার নয় । কিন্তু একটা জিনিষে কখনো লেপটে থাকিনি । যদি কেউ সত্যিই কিছু ক্রিয়েট করতে চায় , তাহলে লেপটে থাকলে চলবে না । সব সময় যদি লেপটেই থাকব তাহলে ছবি আঁকব কখন ? মূর্তি গড়ব কখন ? প্রেম ও নারী এসেছে স্বাভাবিক নিয়মেই , কিন্তু তা নিয়ে বেশি ভাবিনি । এসেছে আবার চলেও গেছে । যখন বুঝেছি ক্ষতি হয়ে যেতে পারে , তখনই ইতি টেনে দিয়েছি ।’’

তাপু এতক্ষণ চুপ করেইছিল, এবার মোক্ষম সেই প্রশ্নটা অশোকের দিকে ছুঁড়ে দিল, তুমি কি প্রেমে পড়েছো ?

Comments

Popular posts from this blog