১১। আক্রমণ......।।

অশোক বেশ একঘেয়ে বোধ করছিল । কতদিন জোনাকির সঙ্গে তার দেখা হয়নি । কোন মানুষ একটানা সাত আটদিন জ্বরে পড়ে থাকতে পারে এ কথা সে বিশ্বাস করতে পারে না । অথচ ফোনে কথা বলার সময় সে শুনেছে জোনাকির কাশি , হাঁফিয়ে ওঠা , ক্লান্তি । আজকাল এত রকমের অ্যান্টিবায়োটিক বেড়িয়েছে যে মুহূর্তে চাঙ্গা । তাই তার মনে হল জোনাকি বোধহয় ডক্তার দেখায়নি একে কি রোগ পুষে রাখা বলে ? নাকি একরাশ হতাশায় নিজেকে সুস্থ দেখতে না চাওয়ার কামনা ! গত পরশু কথা হয়েছিল যে গতকাল তারা দেখা করবে । তবে অল্প কিছুক্ষণ সময়ই কারণ তার নিজেরো বাড়ি ফেরার তাড়া আর জোনাকিরও বেশি ঠান্ডা না লাগানোই ভাল । লাইব্রেরীতে আসবে জোনাকি তারপর তারা একসঙ্গে ওখানেই বসে কিছুক্ষণ কথা বলবে । চে গুয়েভারার ওপরে কোন বই নিয়ে পড়াশুনাও করা যাবে খানিকটা । সেই মত অশোক সমস্ত প্ল্যানিং ঠিক করে ফেলে । অফিসের কাজের প্রোগ্রামটা নিজের সুবিধে মত একটু এদিক ওদিক করে নেয় । সাড়ে তিনটে থেকে পাঁচটা পনেরো কুড়ি , এই সময়টুকুই যথেষ্ট । তারপর সে অফিসে চলে আসবে । বাকি কাজ একটু তাড়াতাড়ি করলে সন্ধ্যে সাতটার মধ্যে সে বাড়িও ফিরে যেতে পারবে । কিন্তু গতকাল দুপুরে জোনাকি তাকে হঠাৎ ফোন করে বলে , আজ যেতে পারছিনা । কালকে দেখব !
অশোক অবাক হয় । -মানে ? আবার শরীর খারাপ ?
জোনাকির কন্ঠে ঈষৎ ঝাঁঝ - কেন , শরীর খারাপ ছাড়া মানুষের অন্য কাজ থাকতে পারে না ? কাল যাব বলেছি বলেই কি যেতে হবে ? নিজেকে কি ভাব তুমি ?
থমকে যায় অশোক । ঠিকই তো । এই অধিকারবোধ তো জন্মাবার কথা নয় ! এই অপেক্ষা এবং আশা ! কিন্তু কথা মত কিছু তো হয়ও না । প্রচন্ড কষ্ট হয় তার । অদ্ভূ একটা অভিমান ভরা কান্না পায় । এও মনে হয় এইসব অভিমানের কোন দাম নেই , তুচ্ছ সব । ভাবে বলেই ফোনটা সে তখনি নামিয়েও রাখে না । তাহলে তুচ্ছ সেই নীলাভ অভিমান খানি সামনে চলে আসবে । আরও কিছুক্ষণ কথা চালিয়ে যায় সে , মহান সেই নির্লিপ্তি তাকে সাহায্য করে এসময় । তারপর স্বভাবিক নিয়মে ফোনটা একসময় নামিয়ে রাখে । সাড়ে তিনটের সময় সে একাই যায় লাইব্রেরীতে । এই প্রথম, কারণ এর আগে সে যতবার এখানে এসেছে জোনাকি ছিল তার সঙ্গে । এখানকার দুই একজন স্টাফেদের সঙ্গে তার পরিচয়ও হয়েছে । মাধুরীদি তার দিকে হাল্কা চোখ কুঁচকে তাকালো । সে পুরনো বই ফেরত দিয়ে নতুন একখানা নিয়ে সোজা টেবিলে চলে গেল । তার মনে হল মাধুরীদি এসময়ও তাকে আড়াল থেকে দেখছে
আজ সকাল থেকে সে নিজেকে প্রচন্ড ব্যস্ত রেখেছে । সমস্ত খুচরো কাজের ভেতরে ছড়িয়ে দিয়েছে নিজেকে । যদিও এর কোন মানে নেই , কারণ ভেতরের চাপা অহংটা মাঝে মাঝেই তাকে নানান ছুতোয়  জানান দিয়ে যাচ্ছে ।
আজ সকালে জোনাকি তাকে প্রশ্ন করল , কি করছো এখন ? খুব কি চাপে আছো ?
সে বলল , না না , আজ তেমন কোন কাজ নেই বলেই আরও বেশি করে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছি ।
- এটা বেশ ভাল । খেলা খেলা কাজ । মিছিমিছি ।
- না , এখন এই মিছিমিছিটাই সত্যি কাজ ।
- আজ সময় হবে ?
জোনাকির প্রশ্ন শুনে আর একটু হলে সে প্রায় বলেই ফেলেছিল - কাল সে একা একাই লাইব্রেরী গিয়েছিল । সামলে নিল নিজেকে , বলল - তুমি আসতে পারবে ?
- পারব বলেই তো জিজ্ঞাসা করছি ।
- কোথায় যাব ? সেই লাইব্রেরীতেই তো ?
- অন্য কোথাও যেতে চাইছো ? তাতেও কোন আপত্তি নেই । আজ যাবই ।
জোনাকির কন্ঠস্বর তাকে উজ্জীবিত করে , ভেবে পায় না একরাতের মধ্যে কি এমন তার হল ? ভাবতেই থাকে সে , আর ভাবতে ভাবতে কিছুটা উত্তেজনাও বোধ করল । ঠিক করল আজ সে ইচ্ছে করেই দেরীতে পৌঁছবে । কিন্তু দেরী করল জোনাকি । প্রায় একঘন্টা পর সে এল লাইব্রেরী , বড়ই ক্লান্ত তার হাঁটার ভঙ্গী । জোনাকির দেরী দেখে সে ক্রমেই হতাশ হচ্ছিল । ততক্ষণ সে একা একাই টেবিলে বসে একটা বই নিয়ে তার পাতা উলটে গেছে , মন বসেনি একটুও । প্রথমে যা ছিল তার অহং , বদলে একরাশ দুশ্চিন্তা গ্রাস করেছে তাকে । অথচ ফোন করতেও হাত উঠছেনা । অস্থির এই ভাবটাকে কাটানোর জন্য একটুকরো কাগজে অনেক সময় নিয়ে হাতের লেখা প্র্যাকটিশ করার মত লিখেছে সে , তাঁহার জমি আমার দেহ , ইতে কী আর আপদ আছে ?
লিখতে লিখতে আবার সেই পুরনো অভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে । মনে হয়েছে একবার এসে পৌঁছক এখানে তারপর দেখাচ্ছি আজ । এই অহেতুক অপেক্ষা করানোর কোন মানে হয় না । আজ সে জোনাকিকে এক হাত নেবে । আজও বলে দিলেই হত যে আসতে পারব না । চুকে যেত সব ল্যাঠা । এইভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখার কোন মানেই হয় নাকিন্তু জোনাকিকে দেখে রাগটা কেমন ফিকে মেরে গেল , কেমন জোলো মত । বলল , আজ তোমাকে চরম পর্যায়ে আক্রম করব বলে বসে আছি , এবং বলতে বলতে মুখটা তার কেমন হাসি হাসিও হয়ে গেল । জোনাকি বলল , কেন গো ? দেরী হয়েছে বলে ?
-এ মনি ইচ্ছে হচ্ছে তাই । তবে করবো এটা ঠিক ।
মিটিমিটি হাসে জোনাকি , বেশ শুরু করো ।  বলতে বলতে টুকরো কাগজটার দিকে উঁকি মারে, কি লিখছিলে ? দেখি একবার ।
মন দিয়ে কাগজটা দেখে সে । বলে , বাপরে ! এত কঠিন শব্দ ! সন্দর্ভ , আখ্যান , বিনির্মা .... এতক্ষণ এইসব লিখছিলে ?
অশোক তাকিয়ে থাকে তার দিকে , মনের ভেতরের পুষে রাখা রাগটাকে ঝালিয়ে নিতে চায় , কিন্তু সফল হয় না । জোনাকি তাড়া দেয় - কৈ বল কি বলবে বলছিলে ?
- নাঃ , এখানে আর হবে না । লাইব্রেরী বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে গেছে । ওঠো এখন ।
- তাহলে চলো গুরুদুয়ারা যাই , যা বলার ওখানেই বলবে !
- এখন অতদূর গেলে তোমার ঠান্ডা লাগবে না ? তারপর বাজে কথা বলে তোমার মুড অফ করেও দিতে পারি , কি করবে ?
- তাইই কোরো । এখন তো তোমার কাছে আমিই একা অপরাধী । আমাকে ছাড়া আর কাকেই বা বলবে ?
অশোক আর কথা বাড়ায় না । পরপর দুটো রাত সে জেগে আছে এটা ভাবলেই তার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে । যদিও এইরকম জেগে থাকার কোন মানে নেই সে জানে , তবু । রাত দেড়টায় সে গতকাল জোনাকিকে তার শেষ এস এম এসটা পাঠিয়েছিল , তারপর ঘুমোবার অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই  তার ঘুম আসেনি । আজকাল প্রায়ই এইরকমই হয় । রাতের অনুভূতিগুলো সব এক এক করে এস এম এসের আকারে লিখে সে জোনাকিকে পাঠিয়ে দেয় । উল্টো দিক থেকে জোনাকিও উত্তর দেয় , তবে রাত্রি সাড়ে এগারোটার পর আর সে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারে না । কাল রাত্রি বারোটা নাগাদ সে অশোককে এবার ঘুমিয়ে পড়তে অনুরোধ করে ।
গম্ভীর হয়ে অশোক বলল - আমি প্রচন্ড আক্রমণাত্বক হয়ে আছি , সবই আজে বাজে বিষয়
জোনাকির বেশ মজা হয় । বলে - আমার কিন্তু খুব ভাল লাগছে । কেমন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে , ঠিক জবাব দিলে বেকসুর খালাস আর না পারলে ঊনপঞ্চাশবার ফাঁসী ।
তারা গুরুদ্বারের বড় গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় । খুব বেশি লোকজন নেই । তারা ধীরে সুস্থে প্রবেশ করে । বাঁদিকে হাতমুখ ধোওয়ার বেসিন । জুতো মোজা খুলে আগে বেসিনে হাত ধুয়ে নেয় , জোনাকি তার মাথা ঢাকে শাড়ি দিয়ে , অশোক রুমাল । লাল কার্পেট মোড়া পথ সোজা চলে গিয়েছে ওয়াই গুরুজী মহারাজের সামনে । জোনাকি তাকে ঈশারায় বলে , তুমি  প্রদক্ষিণ করে এসো । তারপর প্রণাম করবে । নিজে সে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে । তার কথামত অশোক কোনরকমে একবার প্রদক্ষিণ করে কিন্তু প্রণাম করতে পারে না । কেমন একলা একলা লাগে । কস্মিনকালেও এসব তার অভ্যেস নেই । এরপর কিছুক্ষণ নৈঃশব্দ।
ফিরে এসে সে হাঁটু মুড়ে জোনাকির পাশে বসে । দুচোখ বন্ধ করে শান্ত বসে আছে জোনাকি , এই মেয়ে তার অচেনা । গুরুদুয়ারার নির্জন পরিবেশে তার মন অনেকটা থিতিয়ে আসে । চোখ খুললে জোনাকি কে সে বলে , এখানে প্রশ্ন করব ? তোমার ভাল লাগবে ?
-      ঐ জন্যই তো এলাম ,  যেন নিজেকে এইমাত্র নিরস্ত্র করে নিল জোনাকি , তেমন ভাবে বলল , নাও বলো এবার , সব কিছু
অশোক বলে - তোমাকে এখন মনে হচ্ছে প্রতিপক্ষ , তবে শেষ পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে পারলে হয় ।
- ঠিকই তো । তোমার সবথেকে বড় প্রতিপক্ষ আমি , যা কিছু হবে তোমার মনে হবে এজন্য আমিই দায়ীই । আর এটা বহু পুরনো কথা , এর দ্বিরুক্তি আমি করতে বসিনি । নাও বলো ।
- একদম ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব । ইচ্ছে হলে জবাব
- ইচ্ছে হলে জবাব নাও দিতে পারি । এই তো ?
- হ্যাঁ । তুমি বিয়ের আগে শারীরিক ভাবে অত্যাচারিত হয়েছো ?
- এট খুবই মধ্যবিত্ত কথা । কারণ বিয়ে মানে তো শুধু শোওয়া বসা নয় , আরো অনেক দায় দায়ীত্ব নেওয়া । বরং প্রশ্নটা এইভাবে করো , সমাজ স্বীকৃত শারীরিক সম্পর্কের আগে আমার অন্য সম্পর্ক হয়েছিল কিনা ? তাই না ?
লজ্জিত হয় অশোক । তবু জোর করে জেদটা ধরে রাখতে চেষ্টা করে । বলে , তোমার মোবাইল কেন সারারাত খোলা থাকে ? তুমি কি ব্ল্যাক মেলড হচ্ছো ? কেউ তোমায় রোজ ভয় দেখায় ?
- আমি কোন দিন কারুর সঙ্গে তেমন সম্পর্কে যাই নি যে কেউ আমায় ব্ল্যাক মেল করবে । আমি মোবাইল খুলে রাখি তোমার জন্য , যদি তুমি এস এম এস পাঠাও ।
- আমি ? অবাক হয় অশোক । - কাল রাত্রে তো তুমিই আমাকে ঘুমিয়ে পড়তে রিকোয়েস্ট করলে ।
- হ্যাঁ তোমাকে আমিই ঘুমিয়ে পড়তে বলেছিলাম এটা ঠিক । কিন্তু আমি জেগে ছিলাম , কিছুতেই ঘুম আসছিল না । অনেক দিন ধরেই এটা হচ্ছে আচ্ছা এখানে এখনো কেন ভজন শুরু হলনা বলোতো ? বলতে বলতে জোনাকি দূরে গ্রন্থ সাহিবের দিকে তাকায় ।
অশোক দীর্ঘশ্বাস ফেলে । সে কি জোনাকির এগজিকিউটিভ টেস্ট নিচ্ছে , দেখছে কতটা স্বাধ্বী তার এই অরক্ষনীয়া প্রেমিকা !  রোজ রাত্রে এই মেয়েটির শরীর সে খুঁজে বেড়ায় স্বপ্নে অথবা জাগরণে । তখন রঙ মশাল হয়ে জ্বলে সে , শুধু ধোঁয়া আর উজ্জ্বল ফুলকি । কতদূরে সেই আলো গিয়ে পড়ে সে জানে না তখন শুধু একা একা জ্বলে যাওয়া । আর সকাল হলে একরাশ তিক্ততা। এখানে চারপাশটা কেমন নিস্তব্ধ । বাইরে জোরে হর্ন বাজিয়ে গাড়ি ঘোড়া ছুটে যাচ্ছে । ব্যস্ত সমস্ত লোকজন , ভেতরটা কেমন শান্ত । একজন অতি বৃদ্ধ সিংজী এলেন খোঁড়াতে খোঁড়াতে । প্রদক্ষিণ করে আবার ধীরে ধীরে চলে গেলেন । প্রচুর লাল গোলাপ চূড়ো করে রাখা হয়েছে সামনে । ভজন গাওয়া শুরু হবে এখনি । অশোক কি এ সময় একবার ভগবান নামক বস্তুটাকে দেখতে পাবে ? কিংবা সেই হাঁটুজল নদীটা ? ওটাই কি সেই জর্ডন নদী ? পার হলেই জেরুজালেম !
জোনাকি শুধলো , চুপ করে আছো কেন ? আর কি বলবে বলো ? দ্যাখো ঠাকুর বলেছেন কলিকালে যে সত্যিকথা বলতে পারবে সেইই তপস্বী । সৎ । তুমি একটুও মিথ্যে বলোনি । তোমার সাহস আছে , তুমি সব সত্যি কথাই জিজ্ঞেস করেছো
থমকে যায় অশোক । এইগুলো যদি সত্যি কথা হয় তবে তো সে অর্ধেকমাত্র বলতে পেরেছে বাকি অর্ধেক ? সেগুলোর কি হবে ? তার সব সত্যিই তো এখন জোনাকিকে ঘিরে আবর্তিত হয় । বাইরে সেগুলো কেমন শোনাবে ?
জোনাকি আবার বলল , পাঠকরা লেখকদের লেখা বই পড়েন , লেখকরা পড়েন তাঁদের অগ্রজদের লেখা , যেমন সুনীল গাঙ্গুলী কমলকুমার মজুমদারের বই মাথার নীচে রেখে ঘুমাতেন । অনেকে আবার প্রতি বছর রবীন্দ্রনাথ পড়েন নিজেকে রিনিউ করবার জন্য ।
- রিনিউ ? এই জিনিষটা এক্সিস্ট করে আদৌ ?
- করে । পাল্টাতে জানতে হবে । সন্যাসীরও দেহবোধ থাকে , ক্ষিদে কাম মোহ , তবুও নিরন্তর বদলে যাওয়া...
অশোক চুপ করে শুনে যায় । সে এখন প্রায় ধ্বস্ত , হঠাৎ জেগে ওঠা অধিকারবোধ থেকে অনেক দূরে । নিজের ওপর তার রাগ হয় , কষ্ট বোধও জাগে । বলল , তুমি কেন জেগে থাকছ ?  তোমার কেন ঘুম আসছে না ?
- সে আমি কি করে বলব ? ঘুমোতেই তো চেষ্টা করি , না এলে  ?
- আমার কথা শুনে রাগ হচ্ছে না ?
- নাতুমি কি আর এমন বলেছ ? আর একটা কথা শুনবে ?
- কি ?
- কাল রাত্রে জেগে ছিলাম যেমন রোজই থাকি , ভাবছিলাম তোমার এস এম এস আসবে , সঙ্গে সঙ্গে পড়ব । গাছ থেকে তোলা টাটকা ফুলের মত ।
-  কেন সকালে উঠে কি পড়বার সময় পাওয়া যায় না ?
- কবিতার জন্য সব সময়ই সময় , তবু সে এসে মাথার শিওরে দাঁড়াবে আর আমি ঘুমোবো ? নাঃ ওভাবে ঘুম আসে না । আমার কথাটা বলি ?
- বল ।
-কাল রাত্রে তোমার এস এম এস আসা যখন বন্ধ হল , তখনও মাথা ভার । কপালে যন্ত্রণা হচ্ছে । পায়েও ব্যাথা । কিছুতেই ঘুম আসছে না । কাল তুমি ছটা কবিতা লিখে পাঠিয়েছ , তো সেইগুলোই পড়ছি , কি করব , হঠাৎ বুঝলাম দশ দিন পর আবার আমার পিরিয়ড শুরু হয়েছে । এসব অনুচ্চারিত থাকলেই শোভনীয় কিন্তু মেয়েদের ওপর শারীরিক অত্যাচারই শুধু গুরুত্ব পাবে ? মানসিকটা ? তুমি ভাবছ একা তুমিই উত্তেজিত । আমারটা তো তুমি দেখতে পাচ্ছনা । এদিকে বলছ আমাকে আক্রম করবে , ঝগড়া করবে ?
স্বভাবসিদ্ধ বোকাটে হাসিটা ফিরে আসে অশোকের মুখে , ভীষণ লজ্জা পায় সে । - না না ঝগড়া তো করিনি ? তোমার কথা ভেবেই তো বেশি রাতে আর এস এম এস পাঠাই না । আমার না ঘুমনো এখন অভ্যেস হয়ে গেছে । তবে কাল আমার কিন্তু বার বার মনে হচ্ছিল যে তুমি ওদিকে জেগে আছো । আমি আর পারছি না । একদিন তোমাকে আমার বাড়ি ধরে নিয়ে আসব ।
- কি করবে ? খাবে ?
- মানে ?
- মানে তুমি নিশ্চই এক থলি সবজি কিনে এনে আমাকে বলবে না , নাও রান্না করে দাও ।
হেসে ফেলে অশোক ।
- কেন সেটাও তো করতে পারি !
- তা পারো , তোমার তো গুণের শেষ নেই ! তবে কিনা এখন আর সেসব হয় না । তার সময় চলে গেছে । ঋষি    টলস্টয়ের গল্পটা জানোতো ! একটা গল্প উনি লিখেছেন , ফাদার সিয়োর্গি । পাহাড়ের গুহায় ফাদার যখন ব্রহ্মচর্য পালন করছেন , একদিন এক সুন্দরী মহিলা তাঁকে লোভ দেখাতে এলেন । ফাদারের সামনেই নিজের পোষাক বদলানো , বারবার ফাদারকে নিজের কাছে ডেকে নেওয়া , এইসব নানা রকম প্রলোভোন দেখাচ্ছিলেন ঐ মহিলা । কিন্তু ফাদার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মহিলাটিকে এড়িয়ে গেলেন । সেই রাতে প্রবল তুষার পাত হচ্ছিল বলে ফাদার মহিলাটিকে বললেন তুমি এই আগুনের সামনে এসে বিশ্রাম করো , আমি গুহার বাইরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি । ’ মহিলাটি শেষে ফাদারের শরণাপন্ন হয় । এরপর অনেক দিন পরের ঘটনা । ফাদার বেশ বুড়ো হয়েছেন । কিন্তু তাঁর মহিমা তখন সবাই জানে । এক বৃদ্ধ এল ফাদারের কাছে , সঙ্গে তার একমাত্র মেয়েমেয়েটি চলতে পারে না । খোঁড়া । এই মেয়েই বৃদ্ধের প্রাণ । ফাদারের কাছে সে কেঁদে পড়ল । মেয়েটিকে সুস্থ করে দিতেই হবে । আশ্চর্য মানুষের মন । পঙ্গু মেয়েটিকে দেখবা মাত্রই ফাদার প্রবল কাম অনুভব করলেন । চিকিৎসার নাম করে গুহার ভেতরে মেয়েটিকে নিয়ে তাকে উপভোগ করতে চাইলেন । তবে শেষ পর্যন্ত তা তিনি করলেন না । প্রবল অনুতাপ এল তাঁর । লুকিয়ে সবার অলক্ষে গুহা ছেড়ে চলে গেলেন তিনি । দূর শহরে তাঁর একমাত্র বোন থাকত । খুবই গরীব সে । রোজ খাওয়া জোটে না । দীর্ঘ বহু বছর বাদে গিয়ে দেখা করলেন বোনের সঙ্গে । দেখতে পেলেন তাঁর বোন ঘটা করে ঈশ্বর নিয়ে অযথা ভক্তি করে না কিন্তু সে ঈশ্বর বিশ্বাসী । মনে তার শান্তি আছে ।
এরপর তারা দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে । জোনাকি একসময় বলে - তুমি কি আমার পুরনো সম্পর্কটা নিয়ে খুব ভাব ?
অশোক হাল্কা করে হাসে কিন্তু বুকে জ্বালা বোধ হয় । জোনাকি যত সহজে এসব বলতে পারে সে তো কৈ তত সহজে শুনতে পারছে না । তার এখন রাগ হচ্ছে । কেন জোনাকি ঐ ভদ্রলোকটর কথা এখন তুলল ? অশোক বোঝে ওখানে জোনাকির অনেক আক্ষেপ আছে । এ জীবনে তা মুছে যাওয়ার নয় । কিন্তু সেই ভার শুনে অশোক কি করতে পারে ? সে কি জোনাকিকে বলবে , ওগো তুমি তাকে ভুলে যাওনাকি জোনাকিকে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করবে , আচ্ছা উনি কখনও তোমার হাত ধরেছিলেন ? কতটা ঘনিষ্ঠ হয়েছিলে তোমরা ? কোন দিন দুজনে একসঙ্গে গিয়েছিলে কোথাও ? কিংবা উনি কখনও জোর করেছিলেন তোমায় ? তুমি কি এখনও ওনাকে তেমনই ভালবাসো ?  
অশোক দূরে গ্রন্থ সাহিবের দিকে তাকিয়েছিল । তার নিঃশ্বাস পড়ছিল খুব ধীরে । এত দীর্ঘ সময় কোন মন্দিরে বসে থাকা তার জীবনে এই প্রথম । সে কি ভাবছিল সে জানে না । খুব গভীর কিছু ভাবলে তাকে নীল সমুদ্রের মত শান্ত দেখায় । উর্মিমালা কোথায় আত্মগোপন করে ।
শুকনো কোটরে বাসা বাঁধে বসন্ত বৌরী
হাহাকার নিভে যায়। গন্তব্যে মৃত্তিকার জল
বিকিয়ে যাক আনন্দ । আভূমি সমতল।।
দুঃখের ছিটেফোঁটা মেঘ থেকে বৃষ্টি নামে
সারারাত জেগে থাকে কেউ, গোলাপ
পাপড়ি নিয়ে । ধুয়ে দিতে গচ্ছিত ভুল।।
একট লোক এসে তাদের দুজনের হাতে প্রসাদ দিয়ে গেল । দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে অশোক বলে , আমিই তোমাকে আক্রম করব ভেবেছিলাম , উলটে আমিই হেরে গেলাম দেখছি । আমি এখনও ঈশ্বর টিশ্বর দেখতে পাইনি কিন্তু এটা বিশ্বাস করি আর কেউ তো সেটা দেখেছে !
- আমিও । তুমি প্রসাদটা খাচ্ছনা কেন ? খেয়ে নাও , দেখো খুব ভাল লাগবে ।
- তুমি কি করে জানলে ?
- আমি প্রায়ই আসি । এইসব প্রসাদ খুব দামী ঘি দিয়ে তৈরী হয় ।
- তুমি কিচ্ছু জানোনা । ওসব দামীটামি কিচ্ছু নয় , সব দোকানের জিনিষ।
- এই ! এইবার কিন্তু তুমি ঝগড়া করছ।
- ঝগড়া না করলে শুধু শুধু এলাম কেন ?
- ঠিক আছে কাল কোথায় ঝগড়া করবে বল ? কাল চল দুর্গার কাছে যাই ।
- তুমি যে বলেছিলে দুর্গা চলে গেছে ?
- আঃ হাঃ ! অন্য বাচ্ছারা কেউ নেই না কি ?
- একটা কথার জবাব দাও তো ।
- কি ?
- গত একবছরে তোমার এত পরিবর্তন কি করে হল ?
ভারী অবাক হয় জোনাকি । - আমার পরিবর্তন ?
- গত বছরে তোমাকে যা দেখেছিলাম , এখন তুমি আর সেই রকম নেই ।
- থাকব কি করে ? এখন তুমি আরও কাছে চলে এসেছ । আমরা এখন  সবকিছুই শেয়ার করি । যেটা  শেয়ার করিনা সেটা এমনিতেই দুজনে বুঝতে পেরে যাই । ঠিক কি না ?
অশোক চুপ করে থাকে । জোনাকি বলে , তাছাড়া এখন মন খারাপ করাটা একটু কমেছে । আগে সব সময় পাগল পাগল লাগত । এখন অনেক ধাতস্থ হয়েছি । আমার মেয়ে যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে । ওর খুব বেশি আমাকে প্রয়োজন পড়ে না । মেয়ের বাবার নির্দিষ্ট সময়ে রেডি করে খাবার পেলেই হল । আমাদের দুজনের সম্পর্ক শুধু প্রয়োজনের । আর রাত্রে আমরা সবাই আলাদা শুই । সময় কাটানোর জন্য বই পড়ি কিন্তু বই ছাড়া যদি আর কিছু পাই তো বই পড়া আমি ছেড়ে দেব । পড়তে আর ভাল লাগে না ।
- কেন ?
- পড়ার পর মনের ভেতরে অনেক রকম তোলপাড় হয় । নতুন চিন্তা তৈরী হয় । সেটা তাড়া করে বেড়ায় । জানো না সাহিত্য সম্রাট একেই তো বলেছেন জ্ঞানবহ্নি ।
- তোমার মত আমারওএক বছর আগে তুমি বলেছ , এসো একসাথে বিপাসনা শিখি । যদিও বিপাসনা একার ধ্যান , আমি তাতে রাজী ছিলাম আমরা একসঙ্গে কত ঘুরেও বেড়িয়েছি তখন । এর মধ্যে তুমি একা একাই সংস্কৃত শিখছ। উপনিষদ পড়তে শুরু করেছ । নিয়মিত ক্লাশ করতেও যাও , কিন্তু আমার কোন নির্দিষ্ট রুটিন নেই । আমাকে বাজার , বাচ্ছা পড়ানো , অফিস সবই করতে হয় ।
- হ্যাঁ , আমাকে তোমার অনুমতি নিতে হত , অথচ সেটা নিই নি । এইটা সত্যিই জরুরী ।
- আমার অনুমতি নিয়ে তুমি উপনিষদ পড়বে ?
- কার এক যাত্রায় পৃথক ফল হোক আমি চাই না ।
- আমরা কি বুড়ো হয়ে গেছি ?
-আমরা বিচক্ষণ হয়েছি । ম্যাচিয়র , যার কোন শেষ নেই
অশোক থমকায় । সে কি সংকীর্ণ ? কথাটা মনে আসতেই বুকটা তার হা হা করে উঠল । এটা ঠিক , পরতে পরতে শারীরিক চাহিদার অপূর্ণতা তাকে আজ এই পরিস্থিতির সম্মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে । কোন রকম জানাজানি হলে তাদের দুজনের পরিবারই ছারখার হয়ে যেতে পারে । জোনাকি বারেবারে তাকে সেই ঈঙ্গিত দিয়েছে । জোনাকি বলতে চায় নিজের ইচ্ছে তৃপ্ত হোক বা না হোক , সবার ওপরে প্রত্যেকের মঙ্গল কামনাই বড় জিনিষ । এরপর শহর দেশ পরিবার ইত্যাদি । অশোকের অত সহ্য হয় না । তার নিজের মধ্যে অহরহ যে প্রবাহ , তার আবেগ আকাঙ্খা , এগুলো নিয়েই ভাবিত সে । কিন্তু জোনাকির এহেন আত্মসমর্পনে সে নিশ্চুপ হয়ে যায় । পরিষ্কার বুঝতে পারে জোনাকি তাকে অন্য এক স্তরে নিয়ে যেতে চায় । সেখানে প্রেম আছে , কিন্তু তার রঙ অন্য রকম। সেখানে কামও আছে , কিন্তু তার রূপ পৃথক । কিন্তু বন্ধন নেই । তাই গড়পড়তা টানা হেঁচড়াও অনুপস্থিত । অশোকের আবার কষ্টবোধ হয় কিন্তু সে এই বোধ আর পেতে চায় না ।
জোনাকি বলল - তুমি কতদিন এখানে আছ অথচ তোমার সঙ্গে দেখা হল এই মাত্র সেদিন । কেন হল গো ?
অশোক খেয়াল করেছে জোনাকির কথা বলার এই স্টাইল । এভাবে কথা বললে সে কাম মিশ্রিত অকারণ পুলক অনুভব করে । হঠাৎ অনুভূত হয় তারা কতখানি একে অন্যকে ভালবাসে । সবথেকে বড় কথা জোনাকির প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ তৈরী হয় । অমোঘ এবং অনঘ ।
-      কেন আমিও তো তোমাকে কত খুঁজেছি । এখন যেখানে তোমার বাড়ি , ওখানে কত ঘুরে বেড়িয়েছি একসময় । কি জঙ্গল আর নির্জনতা ছিল তখন ওখানে । কোন একদিন তুমি এখানে থাকবে বলে ঐসব আগাছার ভেতরেই ঘুরে বেড়িয়েছি । তোমাকে দেখতে পাইনি , তার বদলে শেয়াল চোখে পড়েছে ।
হেসে ফেলে জোনাকি । - তোমার এমনিই হওয়া উচিত । তুমি সব সময় ভুল জায়গায় ভুল জিনিষ নিয়ে ভাব গোঁসাই । কিচ্ছু হবে না তোমার । আমি তখন কোথায় !
অশোক ভাবে এখনও কি সে ভুল জিনিষ নিয়েই ভাবছে ?  অনুভব করে  পুরনো সেই কষ্টবোধ আবার ফিরে আসছে তার । মনে হয় জোনাকির এই ক্লান্ত কন্ঠস্বর , চোখের নীচের লালচে দাগ ,সব মিলিয়ে তার এসব বলা ভুল হয়ে যাচ্ছে । অবিচার । তাই সে পকেট থেকে নিজের পেন ড্রাইভটা বের করে জোনাকির দিকে এগিয়ে ধরে , বলে , এটা নাও ।
- কি করব এটা নিয়ে ?
- তোমাকে বলেছিলাম না , আমি একটা গিফট্ দেব ?
- গিফট্ কেন ?
বাতাস হাতড়ে শব্দ খুঁজে এনে অশোক বলে - ঐ যে সেদিন তুমি আমার লেখা কপি করে দিলে । তাই।
ঠিক তখনি ভজন শুরু হয়। কীটা অন্দর কীট কর দোষী দোষ ধারায়, নানক নির্গুণ গুণ করে গুণোবতীয় গুণ দেয়।

পরদিন অফিসে পৌঁছনর আধঘন্টা পরই জোনাকির ফোন পায় অশোক । জোনাকি বলে - আক্রম করব বলে গতকাল কি সব কতগুলো আজেবাজে কথা বললে ? যার কোন মানেই নেই । আসল আক্রম তো তোমার পেন ড্রাইভটা । তুমি ঠিক জান কিসে আমাকে কেটে ফেলা যায় !
- সবটা দেখেছ ?
- দেখেই তো বলছি । অনেক সময় নিয়ে আস্তে আস্তে দেখলাম ।
- কি মনে হল ?
- বলব না । আগে বল কি করে তুমি এতকিছু আমাকে লোকাতে পারলে ?
- কিছু লুকোয়নি তো ! সেদিন বলিনি তোমাকে যে আমি গঙ্গাসাগর যাচ্ছি ।
- তা বলেছিলে , কিন্তু ....
- আমি গঙ্গাসাগর যাচ্ছিলাম রামগঙ্গা দিয়ে । যেতে যেতে আমাদের গাড়িটা একটা দারুণ সুন্দর নদীর ওপর দিয়ে পার হচ্ছিল , তখন মনে হল ওটা বোধহয় পৃথিবীর বাইরের কোন নদী । ব্রীজের ওপরে গাড়িটা দাঁড় করালাম । দেখলাম আবছা কুয়াশার দিকে স্রোত বয়ে চলেছেদুপাশে উঁচু ভেড়ী , প্রচুর পাখি বসে আছে সেখানে । বালির ওপরে কিছুদূর অন্তর বাঁশ পোঁতা রয়েছে । তাতে জেলেদের লম্বা জাল বাঁধা । তখন জোয়ার । অল্প অল্প জল ঢুকছে নদীর ভেতর । দুপাশে খাঁড়ির মত গর্তে জল এসে জমছে
- নদীটার নাম জানতে পারলে ?
- সুতারবাক ।
- সুতোর মত বাঁকা ?  না হাসতে হাসতে বেঁকে গেছে ?
- সূত্র থেকেও সুতো নাম হতে পারে । আবার সুতারের অন্য মানে হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন অত্যুচ্চ ধ্বনি বিশিষ্ট । বর্ণজ্ঞান ও অর্থবোধ রূপে শ্রবণজোয়ারের সময় নদীতে অদ্ভূত একটা শব্দ উঠছিল । জলের বুকে কোথাও হোগলা গাছ মাথা তুলেছে । মজাটা হল ব্রীজ থেকে নামতে যাব , বাঁদিকে একটা ঘর । খড়ের চাল , মাটির দেওয়াল । জানলা আছে না নেই বোঝা যায় না । শুধু ভাঙা মত এক দরজা , চ্যাঁচার তৈরী । এদিকটায় একটা বাঁশ পোঁতা , মাছ ধরার জাল খাঁটানো আছে তাতে । ঘরের চালায় আর একটা মাছ ধরার জাল ? শুকচ্ছে । চারধার বিলকুল ফাঁকা । কোন মানুষ নেই । ঘরটাকে দেখেই চেনা চেনা লাগল ।
- আমি জানি । দুর্গার ড্রইং খাতার ঘর , ও এটাই এঁকেছিল তারপর ?
- ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছি যদি কারুর দেখা মেলে ! পেছন দিকে একটা খেজুর গাছ তার তলায় দুটো কানা উঁচু অ্যলুমিনিয়ামের থালা আর একটা তোবড়ানো হাঁড়ি । খেজুর গাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলছে । অনেক অপেক্ষার পরও কাউকে দেখতে না পেয়ে আমি পায়ে হেঁটেই ব্রীজ পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম । দুপাশেই সবুজ বাবলার সারি । বেশ কিছুটা যাওয়ার পর কটা দোকান , আমি চা খাব বলে একটার সামনে গিয়ে থামলাম । একদিকে প্রচুর টমেটো বস্তাবন্দি করে রাখা । পাশেই মোটর ভ্যান , সেখানেও বস্তা ভর্তি টমেটো গাদাগাদি করে রাখা । কয়েকটা বস্তার মুখ খোলা , বোঝাই যায় সেগুলোর ব্যবহার এখনও শেষ হয়নি ।
- দুর্গার আঁকায় এইসব লাল টমেটোই ছিল
- কি করলাম জান ? তখনই মোবাইল বের করে ছবিগুলো মেলাতে শুরু করলাম । উঁচু লাঠিগুলো মাছ ধরার জাল আর ত্রিভুজটা জাল শুকনোর ছবি ।
- তুমি পেন ড্রাইভে এই গুলোই তো সাজিয়ে দিয়েছ । একদিকে দুর্গার বাড়ি , অন্যদিকে লাল লাল টমেটো ।
- হোমের বারান্দায় বৃষ্টির স্রোত দেখে দুর্গা কেমন হয়ে গিয়েছিল মনে আছে ? এখন সব পরিষ্কার । এই নদীটাকেই ও মনে মনে ভাবছিল সেদিন । তারপর জানো আমি আবার সেই ব্রীজের দিকে যাব যাব ভাবছি, চায়ের দোকানীকে জিজ্ঞেস করলাম , দাদা এই গ্রামের নাম কি ? দোকানী বলল , আঠেরো ঘেরী । আপনি কি কারও বাড়ি যাবেন ? ততক্ষণে লোকজন জমে গেছে কিছু । ওখানে আমি বহিরাগত ,আর তারা আমাকে তখন সন্দেহের চোখে দেখছে ।
- তুমি বুঝতে পারনি ?
- কি করে বুঝব ? আমাকে ওরা তখন ধান্দাবাজ ভাবছে । ভাবছে আমার কোন বিশেষ উদ্দেশ্য আছে । আজকাল মানুষ মানুষকে বেচছে। কোনো বিশ্বাস নেই। কি যে অবস্থা কি বলব ?
- কৈ এসব তো তুমি বলনি আগে ? পেন ড্রাইভে যে বউটার ছবি দিয়েছ ওই কি দুর্গার মা ?
- দাঁড়াও দাঁড়াও ! একে একে বলছি । ঐ লোকগুলো তো আমায় তখন নানান প্রশ্ন করতে শুরু করেছে । আমি ওদের বললাম সাগর মেলা কভার করতে যাচ্ছি । পকেটে একটা পত্রিকার আই কার্ড ছিল , বার করে দেখালাম । একজন বেশ বিজ্ঞের মত , তাকে বললাম , একটা মেয়ে হারিয়ে গেছে , তার বাড়ি খুঁজছি ।
- কোথাকার মেয়ে ? বয়স কত  ?
- বয়স বছর পাঁচেক হবে । মাস পাঁচেক আগে হারিয়েছে , সব জায়গায় তল্লাশি হচ্ছে ।
চাওয়লা এতক্ষণ উৎসাহ দেখাচ্ছিল , এখন পাগল ভাবতে শুরু করেছে আমাকে । একজনকে দেখিয়ে বলল দুলাভাই, মাথায় পানি ঢালতে হবে মনে হচ্ছেতোমরা দেখো ।
আমি মোবাইল বের করে দুর্গার ছবি দেখালাম ওদের । বিজ্ঞ মত লোকটা বলল - এ কি আপনার মেয়ে ?
-      না না ! ওকে ট্রেনের কামরায় পাওয়া গেছিল , এখন মিশনারিতে রাখা আছে । আমি দেখেছি । আমার মনে হয় এই মেয়েটার এখানেই কোথাও বাড়ি ছিল
দুর্গার ছবি দেখে বিজ্ঞ মত সেই লোকটা আর একজনকে ডেকে বলল , এই রফিক এ আয়েষা না ? দেখে তো মনে হচ্ছে জলিলের হারিয়ে যাওয়া মেয়েটাই । বলা মাত্রই সবাই ঝুঁকে পড়ে দেখতে শুরু করল, বিজ্ঞ লোকটা গম্ভীর হয়ে বলল , মেয়ে হারিয়ে যাওয়া বহুৎ ঝামেলা । এখন পুলিশ ধরবে কে ? থানায় যাবে কে ? তা এখন কোথায় আছে যেন ?
- মিশনারিজ অব চ্যারিটির হোমে ।
- সে বেহেস্ত বা জাহান্নম যাই হোক জলিল আর যাবে না । ও আপদ গেছে ভালই হয়েছে । পরপর মেয়ে জন্মানোর জন্য ফতিমাকে সে তালাকও দিয়ে দিয়েছে , দু বছর পার হয়ে গেছে ।
- জলিল থাকে কোথায় ? তাকে একবার ছবিটা দেখাতে পারলে ভাল হত ।
- এখন নেই । চিংড়ি চাষ করতে গেছে । কেরালা।
- ফতিমা কোথায় ?
- সে কি করে জানব ? ফতিমা আবার শাদি করেছে , একগাদা বাল বাচ্ছা । এ মজিদভাই এনাকে নিয়ে যা না !
- আমি ? মারধোর খাব না কি ? না না !
- মার কেন খাবি ? ওরাই তো বলে মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল ? সেবারে ফতিমা এখনে এসে কত কান্নাকাটি করল মনে নই ? উনি যদি সত্যি খোঁজ দিতে পারেন , ভালই তো !
মজিদ উল্টো দিকে হাঁটা দিল । আমি বেকুবের মত দাঁড়িয়ে ভাবছি কি করা যায় ? কিছুক্ষণের ভেতরে আবার মজিদ এসে হাজির । একটা দিক নির্দেশ করে আঙুল তুলে বলল , জালাল জানে ফতিমার বাড়ি । আপনি ওর সঙ্গে চলে যান । যা আছে কপালে ভেবে হাঁটা লাগালাম জালাল নামের লোকটার সঙ্গেজালাল বলল , গাড়ি যাবে না কার রাস্তা বলে কিছু নেই । ফতিমার দেখা পাওয়া গেল প্রায় একঘন্টা পর । সে নাকি জালালের কি রকম বোন । দিন তিনেক আগে এসেছে । সেই একইরক মাটির ঘর , চ্যাঁচার দরজা । উঠোনে পা দিয়ে জালাল , ভাবী ভাবী বলে ডাকল । বেরিয়ে এল একজন লোক  - কি রে ? কি চাই ?
-      ইনি ফতিমার মেয়ের ছবি নিয়ে এসেছেন । ভাবীকে দেখে দিতে হবে ।
এই লোকটা নাম মুকুল । সে বলল , আপনি কি এনজিওর লোক ?
আমার হয়ে জালালই  জবাব দিল । বলল - ঐ রকমই । তুই ভাবীকে ডাক ।
ফতিমা পেছনেই এসে দাঁড়িয়েছিল । মুখটা কান্না কান্না । আমি দেরি না করেই মবাইল খুলে ছবিটা ওর দিকে তুলে ধরলাম । দেখা মাত্রই ও আয়েষা বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল । ওর পায়ের কাছে তখন দুটো বাচ্ছা দাঁড়িয়ে । ধমকে ওঠে মুকুল , চল্ ঘরে চল্ !  আর আমাকে প্রায় গম্ভীর হয়ে বলে , কোন দলের লোক আপনি ? নিশ্চই বিরোধী দলের । যোগ সাজোস করে আমাকে ফাঁসাতে এসেছেন ? ফের যদি কোনদিন দেখি গাঙের জলে খুন করে ফেকে দিয়ে আসব ....
এদিকে বেশ কিছু লোক জন জড়ো হয়েছে , সবাই চুপ । কেউ কিচ্ছু বলছেনা । মুকুল নামের লোকটা তখনও গাল দিয়ে যাচ্ছে । মনে রাখবি আমরা আশরাফিতোদের মত নিচু জাত নই।
এরপর অনেকক্ষণ তারা চুপচাপ । অশোকের মনে হল নিঃশব্দে কাঁদছে জোনাকি । বাতাসটাও এত শান্ত যে অন্য কোন শব্দ নেই । সে শুধু কথা বলার জন্য বলে , দুর্গার আসল পরিচয় ও এখন যেখানে আছে , সেটাই । অনেক ভাল মানুষ হবে ও , পড়াশোনা শিখছে
- কিন্তু নিজের ঘর কোন দিন ফিরে যেতে পারল না মেয়েটা !
- ঐ ঘরে থাকলে কি হত ও । কিচ্ছু পেত না , ভাল খাওয়া , চিকিৎসা কিচ্ছু না ।

- তবু তো নিজের ঘর ! যতই গরীব হোক , তুমি বুঝবে না ।

Comments

Popular posts from this blog