৯। রেপ........।।

অনেকদিন আগে অশোক একটা চিঠি পেয়ে ভারী অবাক হয়েছিল । চিঠিটার মূল বক্তব্য ছিল, মাননীয় সুপ্রীম কোর্ট ১৩। ০৮। ১৯৯৭ এর বিশাখা ও অন্যান্য বনাম রাজস্থান সরকার ও অন্যান্যদের মামলায় যে নির্দেশিকা জারি করেছেন তার ভিত্তিতে একটা কমিটি গঠন করা হল , যে কমিটির প্রিসাইডিং অফিসার , মেম্বার কনভেনার , একজন মহিলা ডাক্তার আর দুর্গাপুর কোর্টের একজন মহিলা উকিল হলেন চার মহিলা সদস্য । আর বাকি দুই পুরুষ সদস্যের সে একজন । সেই চিঠিতে যৌন নির্যাতনের ব্যাখা আছে । 
সুপ্রিম কোর্টের ঐ রায় রাজস্থানের এক সোশ্যাল ওয়ার্কারের নৃশংস গণধর্ষণের প্রেক্ষিতে দেওয়া । যাতে কাজের জায়গাতে মেয়েরা সুরক্ষিত থাকতে পারে। অশোক নিজের নাম ঐ চিঠিতে দেখে অবাক হয় । ধর্ষণ কথাটা এসেছে ধৃষ্ ধাতু থেকে। যার সাধারণ মানে হিংসা । নারীর প্রতি যেকোনো হিংসা নির্যাতনই তো ধর্ষণ মহিলা এবং যৌন নির্যাতনের ব্যাপারে তার নাম কি করে থাকে ভেবে তার আশ্চর্য্য লাগে তার ডিপার্টমেন্টে মহিলা রয়েছেন । কাজ ছাড়া তার বাইরে যে মেয়েদের সঙ্গে মেশা যায় সে ওসব স্বপ্নেও ভাবতে পারে না । কাজের ক্ষেত্রে হলেও মেয়েদের সম্পর্কে সে যথেষ্ট শক্ত । কোন ফাঁকিবাজি সে বরদাস্ত করতে পারে না । আসলে সে অনেকটাই মধ্যপন্থী ডান বা বাঁ কোনদিকেই সে বেশি ঝুঁকে পড়ে নাতার এই স্বভাব তাদের এম ডি সাহেবও জানেন । মিটিং হলে বরাবর সে নিরপেক্ষ থাকে তিনি জানেন সেটা । সহজে তাকে কোনোদিকে টাল খাওয়ানো যায় না । কথা সে বরাবরই কম বলে , তাই দু পক্ষই সবসময় ধরে নেয় সে বুঝি তাদের দলে । হতে পারে কমিটি এইজন্য তাকে এখনও রেখে দিয়েছে
কিন্তু কমিটিতে থাকার জন্য তার বেশ বিরক্ত লাগে । অনেক দিন জোনাকির সঙ্গে তার দেখা হয় নি । সেই যে সেদিন দুপুরে দুর্গার আঁকা ছবি দেখতে দেখতে সে প্রায় বিহ্বল হয়ে জোনাকিকে ফোন করে তারপর ব্যর্থ একটা শব্দের ভেতরে আটকে গেল , সেই অব্দি এসে সে ওখানেই থমকে আছে । না আর সে পরে জোনাকিকে ফোন করেনি । জোনাকির কাছ থেকেও কোন সাড়া পাওয়া যায় নি । আশ্চর্য্য লাগছে তার জোনাকির সঙ্গে কথা হচ্ছে না বলে ঢিমে আঁচের মত একটা রাগ তার মনের ভেতরে আস্তে আস্তে গেড়ে বসছে । অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । একটু কথা বলার মধ্যে লুকিয়ে থাকে বেঁচে থাকার রসদ এটা সে আজকাল ভালোই বুঝতে পারছে । এই উপলব্ধি হওয়া তার বাকি থেকে গেছিল এটা জেনেও সে দারুণ আশ্চর্য্য বোধ করে । মোবাইলটা নিয়ে আজকাল সে অনর্থক ঘাঁটাঘাঁটি করে । বারবার কল লিস্ট দেখে , যদিও সে ভাল করেই জানে এই দেখা তার অবান্তর । কেবলই মনে হয় সে দারুণ ভাবে যখন নিজের কাজে ব্যাস্ত ছিল , তখন দু দুবার জোনাকির ফোন বেজে গেছে । সে শুনতে পায় নি । এমনই এক অলীক স্বপ্নে তার দুপুরগুলো পার হয়ে যায় । আজ কোর্টের চিঠি দেখতে দেখতে সে বারবার ভাবছিল জোনাকিকে সে একবার ফোন করবে কিনা ! যতই সে একথা ভাবছিল ততই সে গম্ভীরতর হচ্ছিল । নির্লিপ্তির গেরুয়া রঙ তার চোখে  মুখে হাত বুলিয়ে চলে যেতে যেতে কি এক অদ্ভূ মায়ায় আবার পেছন ফিরে চেয়ে দেখছিল । জুতোর ভেতরে তার দুই পা আর পায়ের আঙ্গুল জ্যোৎস্নালোকিত চন্দ্রমায় কি এক অর্নিদ্দেশ্য যাত্রায় বের হবে হবে করেও কিসের জন্য যে তখনও আটকে রয়ে গিয়েছিল ! সে সোমাদিকে ফোন করে । বলে - সোমাদি বিকেলে আমার কিছু অন্য কাজ আছে । আজকের মিটিংটা পেছিয়ে কাল করা যায় না ?
ফোনে কথা বলার সময় তার দুই হাতের আঙ্গুল তবু নিশব্দ অপেক্ষায় থাকে, যদি আজ কেউ ভুল করেও তাকে ডাকে ।
সোমাদি বলল - হিয়ারিং এর নোটিশ একবার দেওয়া হয়ে গেলে আর তো পেছোনো যায় না অশোক! তুমি আজ কোথায় যাবে ? মিটিংএ চলে এসো , চিন্তা নেই । তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে ।
আজ সে কোথায় যাবে নিজেরও সঠিক জানা নেই । কোথাও যাওয়া কি আজ এতই জরুরী ? সঙ্গে সঙ্গে তার মন বলে , জরুরীই তো !
মুখে বলে - হ্যাঁ , মেয়ের বই কিনতে যাব ।
-      সে মিটিংএর পর গেলেও হবে । তেমন হলে তুমি নাহয় আগেই চলে যেও । কিন্তু অশোক হিয়ারিংএ না এলে হবে না ।
সোমাদিকে সে সম্মতিসূচক ব্দে জানিয়ে দেয় সে সেটাই করবে । ফোন রেখে দেবার পর হঠাৎ তার মনে হয় , আরে !! সে তো আচ্ছা বোকা ? জোনাকিকে একবার ফোন করাই যায় । যদি সে কথা বলতে না চায় সঙ্গে সঙ্গে নাহয় নামিয়ে রেখে দেবে ! কার বেশ কিছুদিন হয়ে গেল সে দুর্গার খবর জানে না । কেমন আছে দুর্গা এটা বলার জন্য তো অশোক এখন জোনাকিকে জিজ্ঞাসা করতে পারে ! পারে না ? ভাবা মাত্রই নাম্বারটা সঙ্গে সঙ্গে ডায়াল করে ফেলল সে , প্রথমে একটানা অনেকক্ষণ রিং হয়ে গেল ওপাশে । কেউ ধরল না । তারপর দ্বিতীয়বার সে যখন ডায়াল করবে করবে ভাবছে  , জোনাকিই কল করল তাকে । রিসিভড বাটনটা সে কিছুতেই প্রেস করতে পারছে না তখন । বুকের ভেতরে তার ভীষণ শব্দে দামামা বাজছে । কলটা রিসিভ করে কি বলবে সে জোনাকিকে ? তার খুব মন খারাপ করছিল একথা বলা যায় ? ওদিকে জোনাকির কানে কেমন শোনাবে সেটা? নিজের ওপর তার বিরক্ত বোধ কাজ করে । অনেকক্ষন রিং হয়ে তারপর বন্ধ হয়ে যায় কলটা । দু সেকেন্ড পর একটু সামলে ফের জোনাকিকে ফোন করে অশোক । তার কন্ঠস্বরে এবার আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া । - কেমন আছো ? অনেকদিন কথা হয় নি , তাই ভাবলাম ....
-      তাই তো ? অনেকদিন কথা হয় নি না? কতদিন হয়নি বলতে পারবে ?
কি উত্তর দেবে সঠিক ভেবে পেলনা অশোক । আত্মবিশ্বাসটা মুহর্তে কেমন ফিকে হয়ে গেল তার ।
- কি হল কথা বলছ না যে ? বুঝেছি তুমি রেগে ছিলে তাই না ?
- না না , রাগ টাগ আমার সেরকম হয় না ! এই কথা বলতে পেরে অশোকের মনটা বেশ হাল্কা হয়ে যায়
- ওঃ ! তাহলে তো একটা ভুল কথা বলে ফেললাম , কিছু মনে করলে নাতো ?
- আরেঃ ! এতে মনে করার কি আছে ?
- নেই ? যাক বাঁচলাম ।
এমন করে কথা বলছে জোনাকি যেন গতকালই তাদের কথা হয়েছে । খুব ভাল লাগছিল অশোকের যে সেদিন দুপুরের প্রসঙ্গটা নিয়ে আর কোন কথা কেউই তারা বলছে না । যেন এইমাত্র তাদের নতুন করে বন্ধুত্ব হল । জোনাকি বলল - তুমি তো  ব্যস্ত থাকো , তাই একটা ব্যাপারে তোমাকে জাননো হয় নি ।
- কি ব্যাপার ?
- দুর্গার আঁকা ছবি দেখে ওদের ফাদার ওকে অন্য জায়গার হোমে এবার পাঠিয়ে দিচ্ছেন ।
- সে কি ? দুর্গা এখান থেকে চলে যাবে ? এসব কবে ঠিক হল ?
- হয়ে গেল মাসখানেক , ওকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করা হবে ।
- তুমি কবে গিয়েছিলে হোমে ? আজ গেলে হয় না একবার ? এতগুলো কথা একসাথে বলতে পেরে অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে অশোক
- আমি তো গতকালই গেছিলামভাল আছে দুর্গা , ... ব্যস্ততার মধ্যে তুমি কি করে টাইম করবে আজ ? তোমার তো রোজই মিটিং থাকে । থাকে না ?
এক নিঃশ্বাসে বলে যায় জোনাকি । অশোক তাকে বলতেই পারে না শুধু তাকে একটু দেখবে বলে সে এইভাবে হাজার ব্যস্ততাকে সরিয়ে ঠিক সময় বের করে নিতে পারবেসেই সেদিনের মত একটু হাল্কা ছোঁয়া , যদি আজও সেই নদীর জলে গিয়ে নামে তারা ; জোনাকি কি একটু সময় বের করতে পারবে না ? আজ অশোক তার সেফটি সু শুদ্ধই জলে নামবে । ভিজুক জুতো মোজা । হাঁটুজল নদীর মাঝখানে একা তারা দুজন ।
বুকের জলদেশে অপার্থিব অর্কিড।
গভীর বালির মধ্যে চাঁদের শব্দ।
আয়ত অন্ধকারে সান্ধ দাবানল।
কুয়াশা ভরা স্রোতস্বিনী শ্বাস।
আর্দ্র হয় চোখ ঠোঁট বনাঞ্চল।
সে বলতেই পারলনা আজ কিছুতেই তার কোন কাজ করতে ইচ্ছে করছে না । এখন আরো কিছুক্ষণ জোনাকির সঙ্গে গল্প করলেই তার ভাল লাগত , আর বিকেলে যদি একসঙ্গে দুজনে কোথাও যেতে পারত ! কতদিন সে আর জোনাকি একসঙ্গে পাশাপাশি হাঁটে নি । একবার মনে হল ধমকে সে জোনাকিকে বলে , ওসব কিছু শুনবনা । আজ তুমি এস । আজ দুজনে কিছুক্ষণ একসঙ্গে থাকব । ভাবা মাত্রই শব্দগুলো উচ্চারণ করল সে , তার কানে শোনাল জোনাকিকে বলছে সে , হ্যাঁ আজ কি করে হবে ? আজ তো আমার আর একটু পর থেকেই জরুরী মিটিং আছে ।
ফোন রেখে দেবার পর সে হিয়ারিং এর কাগজটা ড্রয়ার খুলে বার করল । তারপর পড়তে শুরু করললাঞ্চ শুরু হবে সেই দেড়টায় । তার আগে হাতে এখন একঘন্টা টাইম । কাগজে লেখা আছে জনৈকা সুচন্দ্রা রায় চৌধুরী তাঁর ডিপার্টমেন্টাল হেডের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছে । যদিও থানায় অভিযোগ করেছে কিনা জানা নেই। কোর্টের বিচারের কাছে তারা এলেবেলে। মনে হয় এফ আই আর করেনি।
সে মন দিয়ে হিয়ারিংএর বয়ানটা পড়তে লাগল । মিটিংএ যাবার আগে এগুলো একবার ঝালিয়ে নেওয়া জরুরী । সোমাদি বারবার বলে দিয়েছে । সে গভীর ভাবে রেপ শব্দটার মানে খোঁজার চেষ্টা করে । এসময় তার দুই হাতের পাতলা আঙ্গুলগুলোকে দেখায় বরফে ঢাকা রাস্তায় একাকিনী কোন বিষন্ন ভিক্ষুনী বালিকার মত ।
তোকে নগ্ন করে পুরুষ সময়
নিজস্ব তাগিদ নেই, ধ্বস্ত অন্বয়
নদী দিকচিহ্ন খোঁজে না কখনো
পাথরের খাঁজ টানে, তীব্র আকর্ষণে
তার মনে হল রেপ শব্দটার প্রকৃত মানে আগে কি ছিল ? প্রত্যেক শব্দই নিজস্ব অর্থ বহন করে । সব অর্থই যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তা নয় । কিছু অপ্রচলিত অর্থও রয়েছে তার মধ্যে । কিছু অর্থ আবার বেশ আজব । যে কোন শব্দের অর্থ এবং উৎস সঠিক ভাবে না জানতে পারলে তার ভুরু ক্রমাগত বাঁকাই থেকে যায়অফিসে তার নিজস্ব আলমারীতে এজন্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় আর হরিচর বন্দোপাধ্যায় রাখাই থাকে । কিন্তু সেখানে রেপ নেই। খুঁজতে খুঁজতে বের হল রেপ কথাটা এসেছে ল্যাটিন শব্দ rapere থেকে । যার মানে to snach ,  to grab , to carry off জোর করে আঁকড়ে ধরে ছিনিয়ে নেওয়া । অধিকার করা । শব্দের অর্থ পড়তে পড়তে তার মনে হল সুচন্দ্রার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে তা কি জোর করে আঁকড়ে ধরা ? ঘটনাটা ওদের দুজনের মুখ থেকে শুনতে হবে । অধিকার করার প্রবণতাই বা কতটা ছিল সেখানে ? অবশ্য ইচ্ছা বা অনিচ্ছা প্রমা করাটাই বড় কথা নয় । এটা পাব্লিক কর্মক্ষেত্রঘটনাটা আদৌ ঘটেছে কি না এইটাই তাদের অনুসন্ধানের বিষয় । দোষীকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই । হিয়ারিংএর কাগজ আর শব্দকোষ দুইই উলটে পালটে বারবার দেখে সে । বড়ই ক্ষিপ্র তার গতিবিষন্ন বালিকা করু নয়নে তাকিয়ে থাকে । আজ তার উপোস ।
মন দিয়ে গতবারের শুনানির কাগজটা পড়ে নিলঅনেক রকম প্রস্তুতি করা না থাকলে এ ধরনের কাজে ঝাঁপ দেওয়া ঠিক নয় । এখন রেপ শব্দের ইতিহাস তাকে দেখতে হবে । রোমান আইন অনুযায়ী শুরুতে রেপ ছিল ব্যক্তিগত অবৈধতা বা Private Wrong যে পুরুষটির অধীনে মহিলা বসবাস করতেন আর অন্য যে পুরুষ সেই মহিলাকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে গেল । পার্টি এই দুজন ব্যক্তি। মহিলা ধর্তব্যের মধ্যে আসেন না। রোমান সম্রাট অগাস্টাস এটাকে পরিবর্তন করলেন সম্প্রদায়ের অবৈধতা । Public Wrong পরস্ত্রী গমন থেকে যা পরিবর্তিত হয়ে গেল সম্প্রদায়ের আক্রমব্যক্তি থেকে জড়িত হল সমস্ত পরিবার আর গ্রাম । তবে কোথাও মহিলার কথা ভাবা হয় না। সে আছে শুধুমাত্র পুরুষের শরীর মনের পরিতৃপ্তির জন্য, অন্যকোন ভুমিকা তার নেই।
তাদের কোম্পানীকে ইদানীং তাদের এম ডি বলতে শুরু করেছেন একটা পরিবার । তাই সুচন্দ্রা আর ব্যানার্জী সাহেবর ঘটনাটা আর ব্যক্তিগত স্তরে থাকেও না । সেটা ছড়িয়ে  পড়ে সমস্ত পরিবারের মধ্যে ।
রেপের ঘটনাটার মধ্যে মেয়েদের কথা বিশেষ ভাবা হয়না । মেয়ে মানেই হল একটা সামগ্রী মূল টানাপোড়েনটা যাকে  নিয়ে । রোমুউলাস যখন রোমের পত্তন করলেন তাঁর সাথে শুধু পুরুষ সৈন্যএদিকে সংসার পাততে মেয়েদের দরকার । তাই সৈন্যরা তখন সাবাইন মেয়েদের ধরে এনে সংসার পাততে লাগল । যা হল রেপ । অশোক ধন্ধে পড়ে। রেপ বৈধ না অবৈধ । আইন তো সব  নয় । আবার আইনে কোন দ্ব্যর্থক বোধও নেই । কিন্তু বাস্তবে ? তাই প্রশ্নোওর চলাকালীন নিজে সে সুচন্দ্রাকে জিজ্ঞাস করেছিল - ব্যানার্জী সাহেব যখন তোমায় জড়িয়ে ধরেছিলেন তোমার তখন ভালো লেগেছিল নিশ্চই । সবাই তার দিকে কটমট করে তাকায় । যেন কোন ভয়ংকর অপরাধ সে করে ফেলেছে । কেন ? অবৈধতা কি সুন্দর হতে পারেনা ? সেটা আনন্দদায়কও  হতে  পারে । অযথা নিজের দেরী হবে এইজন্য সে চুপ করে যায় ।
তাদের শুনানি শুরু হয় বিকেল চারটেয় । সুচন্দ্রা খুব সুন্দর একটা সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে । আগে যে টেবিলটা ছিল এখনও সেটাই আছে শুধু একদিকে ছটা চেয়ার অন্যদিকে দুটো । কারণ অভিযোগকারিনী সঙ্গে করে কাউকে নিয়ে আসতে পারেন । তার নিজের হয়ে কথা বলার জন্য। অশোক এতে আপত্তি করেছিল বলেছিল , এটা কি কাঠগড়া ? অপরাধী একদিকে আর অন্যদিকে  বিচারক । তাই টেবিল পাল্টে গোল টেবিল । সবাই সমান , অন্তত শুরুতে তাই মনে হবে ।
কনভেনার মহিলা প্রথম শুরু করল - বলুন সুচন্দ্রা সেদিন কি হয়েছিল ?
সুচন্দ্রা চাকরীতে যোগ দিয়েছে বছর দুই হবে । চাকরী পাওয়ার পরই বিয়ে । বর কলকাতা আর সে এখানে । ফলে ছুটিটা  তাকে একটু বেশিই নিতে হয় । মাঝে মাঝে তো উইদাউট পে সেদিন বেশ অনেকগুলো কাজ জমেছিল তাই সন্ধ্যে হয়ে গেছিল ।
ঊকীল মহিলা মধ্য চল্লিশের । নাম উর্মী তিনি প্রশ্ন করেন , কত সন্ধ্যে ? ঠিক কটা বাজে ?
 - সাড়েছটা , ছটা পঁয়তিরিশ ।
উর্মী বললেন - এমন দেরী সপ্তাহে  কদিন  হয় ?
-      দু তিন দিন তো হয়ই ।
ঊর্মির ডিভোর্স হয়ে গেছে । একাই থাকেন । এক ছেলে সাউথে কোথাও একটা ইঞ্জিনিয়ারীং পড়ছে । এইসব খবর আগেই অশোকের কানে এসেছে - হ্যাঁ বলুন !
- আসলে বাড়ির জন্য তো আমায় ছুটি নিতেই হয় আর স্যরও ছুটি দিয়ে দেন , বলেন দেখিস অন্তত সপ্তার মধ্যে যেন তোর নিজের কাজগুলো হয়ে যায় । তাই কাজ শেষ করতে প্রায়ই আমার দেরী হয়ে যায় । তারপর বাড়ি ফিরি
- বাড়ি ফিরে খুব একা বোধ হয় তো !
- মানে ? ভুরু কোঁচকায় সুচন্দ্রা ।
- না , বাড়ি ফিরে তো সেই একাই । শুধু খাওয়া আর ঘুম ।
- না । নিজের রান্না আছে , একটু টিভিও দেখি সুচন্দ্রা অনির্দিষ্টতায় ভোগে ।
- হ্যাঁ  তারপর ? সেদিন সাড়ে ছটা বাজে, বাকি সমস্ত অফিস নিশ্চই ফাঁকা। আর করিডোর অন্ধকার ?
- নাতো ! করিডোরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত আলো জ্বলে । লোকজন চলে যায় কিন্তু স্যরেরা তো থাকেন ।
- আপনার ডিপার্টমেন্টে কতজন ছিল ?
- আমি আর স্যর ।
- আপনাদের ডিপার্টমেন্ট বেশ বড় জায়গা নিয়ে আপনাদের স্যারের চেম্বার আর অ্যান্টি চেম্বার এককোণে , এসি চলছিল নিশ্চয়ই ?
- স্যরের ঘরে চলছিল । সেন্ট্রাল এসি বন্ধ যায় ।
- বেশ ভৌতিক পরিবেশ । আপনি কি করছিলেন ?
- স্যরের কম্পুউটারে ডাটা এন্ট্রি করছিলাম ।
- আর মিস্টার ব্যানার্জী ?
- উনি আমার পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন ।
- চেয়ারে হাত রেখে ? বাঁহাত ?
সুচন্দ্রা উকিলের দিকে তাকায় , বলে - দুটো হাতেই চেয়ার ধরেছিলেন । মাঝে মাঝে উনি ডিকটেক্ট করছিলেন ।
- তারপর ?
- হঠাৎই উনি হাত দুটো আমার ঘাড়ের ওপর রাখেন । বলেন , কি রে এত টাইপ করছিস ঘাড় ব্যথা করছে নাতো ?
- আপনি তখন প্রতিবাদ করলেন ?
- নাস্যার এত বয়স্ক মানুষ ! আমাকে স্নেহ করেন ।
- আপনি তখনও টাইপ করে যাচ্ছেন ? আর ওনার হাত আপনার ঘাড়ের ওপর ?
- হ্যাঁ একটু পর মনে হল আঙ্গুলগুলো নড়ছে । হাল্কা চাপছে । সরছে ।
উকিল জিজ্ঞাসা করলেন - খুব আস্তে ? এসির হাওয়া যেমন আস্তে আস্তে মুখের ওপর ধাক্কা মারে তেমনি ? ঠান্ডা অনুভূতিটা যেমন সমস্ত শরীরে চারিয়ে যায় তেমনি ?
সুচন্দ্রা চুপ করে থাকে । কোন শব্দ করে না ।
- ব্যস এজন্যই আপনি অভিযোগ করছেন তো ?
- না এরপর স্যরের মাথাটা নীচে নেমে আসে । স্যরের নিশ্বাস আমার ঘাড়ের ওপরে পড়ে ।
অশোকের মোবাইলটা শব্দ করে বেজে ওঠে হঠাৎ জোনাকি । কেটে দেয় সে কলটা । কিন্তু প্রচন্ড আরাম বোধ করে , একটু আগে ঊর্মির বলা এসির ঠান্ডা হাওয়ার মত । কখন সাড়ে চারটে বেজে গেছে কেউ তারা জানে না । নিঃশ্বাস বন্ধ করে এতক্ষণ সবাই ঘটনাটা শুনছিল । সুচন্দ্রার ধারাভাষ্যে যৌনতা উঁকি মেরেছে সবে, এমন সময় ঊর্মি বললেন, ঠিক আছে সুচন্দ্রা আপনি মিনিট খানেক না হয় বিশ্রাম নিন । মেয়েটা হাঁপাচ্ছে তখন । চোখ মুখ লাল । বাকি কমিটি মেম্বাররা নিঃশব্দঅশোক এস এম এস লিখে ফেলল একটা এসময় আর সেন্ডও করে দিল জোনাকির নাম্বারেকল ইউ লেটার !
-      কি হল ? চুপ করে থাকবেন না ! বলুন তারপর কি হল ? যেন অশোকের মোবাইল নাড়াচাড়া করাটা সহ্য হলনা উকিলের
ইতস্তত করে সুচন্দ্রা বলে - না মানে উনি ছেড়ে দিলেন !
-      উনি কি তোমার বুকে হাত দিয়েছেন ?
ঠিক তখনই অশোক সেই অমোঘ প্রশ্নটা না করে পারল না - তখন তুমি দূরে সরে যাওনি ?
এরপর তাদের শুনানি খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল । কেমন বেসুরো লাগছিল অশোকের । মিটিং রুম থেকে বেরিয়েই সে তড়িতে ফোন লাগালো জোনাকির নাম্বারে । -সরি !!
- সরি বলার কিছু নেই আমি জানি ।
- কি জান ? আমি ব্যস্ত এটাই ?
- না । আরও অনেক কিছুই ......
- কি ? দম বন্ধ করে অশোক শুনছে ওপাশ থেকে জোনাকি কি উত্তর দেয় ।
- মিটিং শেষ হয়েছে ?
- হ্যাঁ । এইমাত্র
- এখন তাহলে বেরতে পারবে ?
অশোককে জোনাকি যদি এখন দক্ষিণ মেরু যাওয়ার প্রস্তাব দেয় তাহলেও সে রাজী । কি শুনছে সে ? সেতারে নিখিল বন্দোপাধ্যায় তিলকশ্যাম রাগ বাজাচ্ছেন ? সেই বাজনা অশোক কখনও শোনেনি । আজ শুনল । বলল , হ্হ্যাঁ ...
তুতলে যাচ্ছে তার গলা । - কোথায় যাব ?
-      আমি এখন রিস্টেন এভিন্যুতে আছি । এখানে চলে আসতে পারবে ?
এরপর দেখা যায় তারা এক অদ্ভূ নীরবতার দিকে যাত্রা করেছে । বাইক চালাচ্ছে অশোক আর জোনাকি পেছনে । দুজনেই চুপ । অনেক দূরে বিশাল একটা ওয়ার্কশপের মত । তারপর সামনে দিগন্ত জোড়া মাঠ । কোথাও জন মনিষ্যির চিহ্ণ নেই । একেবারে ধূ ধূ প্রান্তর । আস্তে আস্তে অশোক অফিস , অফিসের মিটিং , সুচন্দ্রা সবাইকে বহুদূরে পেছনে ফেলে এগিয়ে আসছিল । রাস্তাটা এরপর সোজা গিয়ে ঢুকে পড়েছে মিহিন একটা জঙ্গলের ভেতরে । দুপাশে শাল পলাশ ছাড়া আরো নাম না জানা বিশাল বড় বড় গাছ গাছগুলোতে একটাও পাখি ডাকছে না । কি ঘুমন্ত পরিবেশ ! হঠাৎ বদলে যায় জোনাকি । - এ আমরা আজ কোথায় চলে এলাম ?
অশোক দেখে এই রাস্তাটা ক্রমে নির্জনতার দিকে চলে গেছে । নেশার মত লাগে তার । বাইকের স্টার্ট বন্ধ করে দেয় সে । থেমে যায় বাইকটা । থামামাত্রই চারপাশের নির্জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের দুজনের ওপর । ভয় পেয়ে জোনাকি চিপে ধরে অশোকের একটা হাত , প্লিজ চলো এখান থেকে !
-      চুমু ? বলে মাথা থেকে হেলমেট খুলে হাতে নেয় অশোক ।
হকচকিয়ে যায় জোনাকি । - না না , তুমি চলো এখান থেকে ! আমার খুব ভয় করছে !
- একবার চুমু খেতেই হবে , নাহলে ... , নিজেই এগিয়ে আসে অশোক জোনাকির দিকে দুজনের নিঃশ্বাসই গাঢ় , কন্ঠ শুকনো । অশোক প্রায় জোর করে জোনাকিকে । আর সেই অবস্থাতেই বুঝতে পারে সামান্য ক্লান্তি বাদ দিলে তার স্পর্শ উতপ্ত করছে জোনাকিকে । দ্রুত ওঠানামা করছে তার বুক । অশোক তার কান , কানের লতি এক এক করে নিজের ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে শেষে এসে থামে জোনাকির গলায়এসময় তার দুই হাত জোনাকিকে নিজের বুকের সঙ্গে পিষে ফেলতে চায় । নির্মমের মত আচরণ করতে ইচ্ছা জাগে । জঙ্গলের ঝিঁঝিঁরা ছিছিক্কার দিয়ে ওঠে । জোনাকি বলে , ছাড়ো ! লাগছে আমার !
- না ! জমি আর মেয়েমানুষ খালি থাকলেই কেউ ঠিক দখল করে নেবে , বলে আবারো নিজের ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে যায় অশোক জোনাকির দিকে । এবারে তার লক্ষ্য জোনকির ওষ্ঠ । অন্ধকার নেমে আসছে । একটা দুটো তারা দেখা যাচ্ছে । তাদের বাঁপাশ ঘেঁষে শেয়াল চলে গেল একটা । অশোককে হাত দিয়ে সামান্য ঠেলা মেরে জোনাকি বলে , তুমি এমন করবে আমি জানতাম । ভীতু লোক একটা  !
তার দিকে তাকিয়ে বোকার মত হাসে অশোক । দুই হাত সে এগিয়েই রেখেছে , আরো একবার জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে চায় । এতে অন্যায়টা কোথায় ?
-      বারে পুরুষ ! ফাঁকা জায়গা পেলেই হল না ? কাল থেকে আর আসছি না কোথাও ।
নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে অশোক , ফিসফিসিয়ে বলে - প্লিজ আর একবার !
আকাশে তখন তৃতীয়ার চাঁদ উঠে পড়েছে । জোনাকির বাধা সে গ্রাহ্য করে নাচোখের কালো মনি চকচক করছে , স্ফূরিত নাসারন্ধ্র । সে কি বদলে গেল হঠাৎ ? ক্যাবলাটে চেহারা বদলে আগ্রাসীর মত দেখাচ্ছে তাকে এখনজোনাকি প্রাণপন শক্তি দিয়ে তার বাঁ হাতটা টিপে ধরে কাতর স্বরে অনুরোধ করে - আমরা একদিন অন্য কোথাও যাব দুজনে , এখন তুমি এখান থেকে চল প্লিজ !
তার কন্ঠস্বরের কাকুতি শুনেই হোক কি অন্য কোন কারণে , অশোক তাকে ছেড়ে দিল এবার । হয়ত তার মনে হয়েছে সব নির্জনতায় বর্ণমালা ঝরনা হয়ে উঠতে পারে না , সব স্বাধীনতা একটা জায়গা পর্যন্ত এসে তারপর ফিরে যায় পরাধীনতায় ,... 
চাঁদ এক মৃত্যু চিহ্ণ
সূর্য কৌন্তেয় আলোছায়া
অ আ স্বরবর্ণ লেগে
অনুচ্চারিত নদী হয় বর্ণমালা ।
শরীরের ভেতর আর বাইরের ব্যঞ্জণবর্ন
মিলেমিশে শব্দ ও পংক্তিমালা
বড় রাস্তায় উঠে আসার আগে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে শেষবারের মত পেছন ফিরে সেই সুন্দর নির্জনকে দেখল দুজনে । আর কোনদিন আসবে না এখানে তারা । এই জায়গাটা তাদের দুজনের বাড়ি থেকে অনেকদূরে , সম্পূর্ণ অচেনা । ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছিল আজ কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই । অশোক বলল , অত ভয় পাওয়ার কি আছে ? নিজের চোখে দেখতেই তো পেলে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই
-      ঐ জন্যই তো আরও ভয় করল । নাও বাইকের স্পীড বাড়াও এবার ।
পেছনে বসে একদম অশোকের শরীরের সঙ্গে সেঁটে আছে জোনাকি । তার বুক অশোকের পিঠে পিষ্ট হচ্ছে , কিন্তু সে খেয়াল তার এখন নেইএখান থেকে বেরতে পারলে সে যেন বাঁচে । বাইকে স্টার্ট নেয় অশোক । ঠিক সেই মুহুর্তে , পেছন থেকে আওয়াজ পায় - এই বাইক দাঁড় করা !
অন্ধকার ফুঁড়ে উঠে এসেছে তিনটে ছেলে তিনজনেরই পাকানো শক্ত চেহারা । তিনজনে ঘুরে তাদের বাইকের সামনে হাত ধরাধরি করে দাঁড়ালো । এখানটা ঘন অন্ধকার । মাত্র পাঁচফুট দূরত্বে মেন রোড । বড় হ্যালোজেন জ্বলছে পরপর , রাস্তার দুধারে । গাড়িগুলো চলে যাচ্ছে তবে পথচারী কেউ নেই ।
-      না থেকে চলে এলি কেন ? কর্কশস্বরে একজন ধমকে উঠল ।
অশোক বলল - চলে এলাম কোথায় ? এই তো এসে দাঁড়ালাম ।
সঙ্গে সঙ্গে বাকি দুজন বলল , এখানে কি রেন্ডিবাজী হচ্ছে ?
একজন ঘুরে এসে জোনাকির পাশে দাঁড়ায় । মুখে প্রবল অ্যালকোহলের গন্ধ ।
জোনাকি বলে - কি আজে বাজে কথা বলছেন ? উনি আমার হাজব্যান্ড ~
পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করে ছেলেগুলো । -ওখানে গেছিলেন কেন ?
- রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি , চিনতে পারছি না । এবার জবাব দেয় অশোক ।
- এই মেয়েটাকে আগে টেনে নামা তো !
পকেট থেকে মোবাইলটা বার করতে যায় অশোক , একজন তার হাতে বাধা দিয়ে বলে ওঠে - কি মোবাইল মারাচ্ছেন ?
- যার বাড়ি আসতে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি তাকে ফোন করব
- কোথায় যাচ্ছিলেন এখানে ? এই জঙ্গলটায় পরশুও একটা মার্ডার হয়েছে , এই মেয়েছেলেটা আপনার স্ত্রী ?
- হ্যাঁ ।
- আমাদের দুজন যদি একে এখনই টেনে নিয়ে ভেতরে চলে যায় ... এই যেদো টেনে নামা !
অশোক তার পকেট থেকে কোম্পানীর আই কার্ড বার করে সামনের ছেলেটাকে দেখাতে যায়। তার দুই হাঁটু শিরশির করছে । আজ কি তার শিভালরির পরীক্ষা ?
একটা ছেলে নিজের মোবাইল দিয়ে অশোকের কার্ড মন দিয়ে দেখতে যায় , অন্য একজন তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জোনাকির শরীরের ওপরে । ইতিমধ্যে আরো দুজন কোথা থেকে হঠাৎ উদয় হয়ে প্রশ্ন করে , আব্বে ! কি রে ? রেপ কেস হচ্ছিল নাকি ?
দ্রুত অশোক কনট্যাক্টে গিয়ে বিশেষ একটা নাম্বারে ডায়াল করে ফেলে । নাম্বারটা যে আজ এইভাবে কাজে লেগে যাবে আগে কখনো ভাবে নি সে । তার অফিসের একজন মাঝারি গোছের নেতা । কথায় কথায় জেনেছিল এইসব জায়গাতেই কাছাকাছি তাঁর বাড়ি ।
এরপর বাকি আধঘন্টা কি করে পার হল অশোক নিজেও জানে না । তবে একবারের জন্যও জোনাকিকে সে অরক্ষিত মনে করে নি । পুলিশের সামনেও তারা দুজন বেশ নিপু অভিনয় করল । পুলিশ তার মিসেসেরও আই কার্ড দেখতে চেয়েছিল । বলল , আপনাদের মত এইরকম সিনিয়র অফিসারেরা যদি ভুল করে তাহলে চলবে কি করে ?
ওদিকে মিনিট কুড়ির মাথায় সেই মাঝারি নেতাও হাজির । ঐ এলাকার সব ছেলেকেই তাঁর চেনা । ছেলেগুলোকে নেতা বললেন - তোরা যা ।
সব চুকে যাওয়ার পর তারা দুজনে বড় রাস্তায় উঠে বাড়ি ফেরার পথ ধরেছে , বাইকে স্পীড নিয়েছে অশোক , পেছন থেকে জোনাকি বলল - একটু আস্তে চলো । কোন একটা চায়ের দোকান পেলে থেমো ।
থামল অশোক । জোনাকি বলল - মনে হচ্ছে না নারী নরকের দ্বার ?
- এরকম কেন ?
- নয়ই বা কেন ? সবাই জানে তুমি খুব ভাল ছেলে। আর ছেলেদের তো খারাপ করে মেয়েরাই।
অশোক বলল - আমি এরকম ভাবি না ।
- তুমি কি ভাবছো তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই ।
- ভেবে ভেবে মাথা খারাপ হোক কে চায় ? চা খাবে ? বলে দিচ্ছি
        লা বাহুল্য চায়ের স্বাদ দুজনের কেউই পেল না , তবু শেষ পর্যন্ত খেল । খেয়ে আবার উঠল বাইকে । কোন কারণ ছিল না ,অশোক ভাবছিল সুচন্দ্রার কথা । খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে , এসময় অজস্র বৃষ্টি বিন্দু ধেয়ে আসছিল আকাশ থেকে । নিজেদের মাথা  বাঁচাতে হুড়মুড়িয়ে বাইক সুদ্ধ ঢুকে পড়ল সামনে একটা বড় চত্বরে । জায়গাটা একটা আশ্রম । তিলক কাটা বাবাজীরা ঢোলক কাঁধে কীর্তনে নামবেন এবারে , তারই প্রস্তুতি চলছিল বোধহয় এতক্ষণ । কারণ সবাই দাঁড়িয়ে । মন্দির মসজিদ এলে আমাদের হাত নিজেদের অজান্তেই কপালে উঠে যায় । ওরা দুজন মূল প্রাঙ্গনে এসে দাঁড়িয়েছে । বুক সমান শ্বেত পাথরের বেদীতে আধ হাত লম্বা রাধাকৃষ্ প্রচুর গয়নাগাঁটি আর জমকালো পোষাক পরে ভগবানের মত দাঁড়িয়ে আছে । চারজনকে মাঝখানে রেখে বাবাজীরা তুমুল শব্দে কীর্তন মহিমা শুরু করে দিল ।

অব্ তো নিভায়া সরেগী ; রাঁহ ভাহেকী লাজ

সমরথ্ স্মরণ তুম্হারী সহায়াঁ ; সরব সাধার কাজ ।।

Comments

Popular posts from this blog