১২। ১৪ই ফেব্রুয়ারি......।।

ঠিক পৌনে চারটের সময় ফোন করে অশোক । ঘুম জড়ানো গলায় জোনাকি বলে , পাঁচ মিনিট পর উঠছি ।
অশোক বলল , ঠিক আছে আস্তে আস্তে এসো । আমার বাইকটা একটু প্রবলেম করছে , ক্ল্যাচের তারটা পাল্টাতে হবে ।
এরপর দশ মিনিট সে খুব তাড়াতাড়ি হাতের কাজগুলো শেষ করে নেয় । সবার সামনে দিয়ে একবার চক্কর দিয়ে ফের নিজের রুমে চলে আসে । বুঝিয়ে দেয় সে ব্যস্ত । শেষ মুহূর্তের আপডেটগুলো ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা বুঝে নেয় । এও বুঝে নেয় আজ আর কোন মিটিং হবে না । ইদানীং শণিবার বিকেলে মিটিং করার একটা চল হয়েছে । লোকের বিরক্তি বাড়িয়ে যে কি লাভ হয় বুঝতে পারেনা । জোনাকি বারবার বলে রেখেছে মিটিং থাকলে জানাবে । তাহলে আজ আর যাব না । অন্যদিন হবে ।
অশোক বারকয়েক বলার চেষ্টা করেছে মিটিং যে কোনদিন হতে পারে , ঘন্টা খানেক আগে জানতে পারা যায় , আজ যদি হয় তাহলে মিটিং শেষ হবার পর তোমার কাছে যাব । যত রাতই হোক , কিন্তু শব্দগুলো শেষ পর্যন্ত উচ্চার করে উঠতে পারেনি । লজ্জা ? নাঃ লজ্জা জিনিষটা তাকে ছেড়ে কবে চলে গেছে । সংকোচ কি করে প্রকাশ করতে হয় সে জানে না । কারখানায় ওসব করা যায় না বলে সে সেটাও বেমালুম ভুলে গেছে বহু বছর । দ্বিধা বা বিরক্তি তার খুব সহজাত , বলা চলে এই দুটোর সাহায্যেই এতদূর অবধি এসে পৌঁছতে পেরেছে । কখনও সখনও রক্ষা কবচের মত তাকে আড়াল করেও রেখেছে । বাইরে থেকে লোকে বুঝেছে সে ভয়ংকর উদাসীন , চরম নির্লিপ্ত ।
সে ঠিক চারটের সময় বাইক নিয়ে বের হয় । এদিক সেদিক খুঁজতে খুঁজতে বাইক সারানোর দোকান দেখতে পায় । দোকানী বলল , দু মিনিট দাঁড়ান , একটু ঝাড়ু লাগিয়ে নিই ।
অস্থির অপেক্ষা করে সে । দেখা গেল সবই ঠিক আছে , শুধু ক্ল্যাচের তারটা লুজ হয়ে গেছিল ।
মেকানিক যতক্ষণ কাজ করছিল , অন্য একটা দোকান থেকে সে একটা ডেয়ারী মিল্ক চকোলেট কিনে ফেলল তারপর দ্রুত রেলগেট পার হয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছল দেখল মিষ্টির দোকানের সামনে অভিজিৎ দাঁড়িয়ে । তার স্টাফ । আবার বাইকটাকে ঘুরিয়ে উল্টোদিকের একটা ঘুপচি দোকানে গিয়ে ঢোকে । নীচু একটা বেঞ্চ দখল করে একাই বসে সেখানে । ঠিক এগারো মিনিটের মাথায় জোনাকি নামল বাস থেকে । সোনালি রঙের সালোয়ার কামিজ পরা । বাঁ হাতে মাঝারি একটা ব্যাগ । অশোক তাকিয়ে থাকে । জোনাকি দেখতে পায় , কিন্তু চকিতে সরিয়ে নেয় নিজের চোখ । তার দিকে অশোক তিন রাত জেগে থাকা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে ।
জোনাকি বলল , সে চা খাবে , কিন্তু এই জায়গাটায় বড্ড ডিম সেদ্ধর গন্ধ । চা নিয়ে তারা দুজনেই দোকানের বাইরে আসে , আসা মাত্রই অশোক আবিষ্কার করে পাঁচফুট দূরত্বে মানিক দাঁড়িয়ে । বোঝাই যায় কারো অপেক্ষায় আছে । অশোক হেলমেটটা চাপিয়ে নেয় , ফিরে যায় উল্টোদিকে ।
জোনাকি জিজ্ঞেস করল , কি হল ?
সে শুধু বলল , কিছু না । এবার যাব তো ?
বাইকে এই রাস্তা তাদের অনেকদিনের চেনা । স্পীড নিল অশোক । ফ্লাই ওভারের নিচে ভোম্বল দাঁড়িয়ে । এই সময় পেছন থেকে জোনাকি বলে উঠল , বাব্বা , আজ এত ভিড় কেন ? আজ কি সবাই একসঙ্গে বাইরে বের হয়েছে ?
তার কথা  অশোক বুঝতে পারেনা । একটা পাথরে ধাক্কা লেগে বাইক হঠাৎ টলমল করে ওঠে ।
-      এই তুমি কি করে চালাচ্ছ ? দেখো ঠিক করে , আর একটু হলে আমি পড়ে যাচ্ছিলাম
রাস্তার ডানদিকে সৌম্য দাঁড়িয়ে । হাসছে ।
- এই আজ তোমার কি হয়েছে ? আমাকে ভাল লাগছে না , না ?
- না ।
- হবে না , এখুনি ভাল হয়ে যাও । এত চাপ নিয়ে থাকলে কি করে হবে ?
- সময় লাগবে ।
- কতক্ষণ ? চাপ হলে প্রেশার হবে , সুগার হবে । তখন এমনিতেই সবাই জানতে পেরে যাবে ।
- কি জানতে পারবে?
- এই , তুমি ভাল নেই । খুব চাপ তোমার ।
- জানুক ।
- তাপু বলেনি কিছু ?
- বলেছে ।
- কি বলেছে ? বলেনি তোমার কি হয়েছে ? ইস ! ..... না না , এখুনি তুমি ঠিক হয়ে যাও প্লিজ ।
- বললাম যে সময় লাগবে । এত তাড়াতাড়ি হবেনা ।
- না । তাড়াতাড়িই করতে হবে । আমি সাহায্য করব , নিজেই তাহলে বুঝতে পারবে কি তোমার দরকার ।
 বাইক চালাতে চালাতে অশোক উত্তর দেয় , বুঝেছি ।
- কি বুঝলে ?
- এই , নিজেকে নিজেই ঠিক করতে হবে তোমার সাহায্য নিয়ে ।
জোনাকি হেসে ফেলে - তাহলে গোমড়া মুখে থাকবে না । অন্য কথা বলো ।
- এখানে কুড়িটা হাতি এসেছে ।
- তুমি কি করে জানলে ?
- ফেসবুকে দিয়েছে । এইসব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে ।
- তাহলে তো সাংঘাতিক কান্ড হয়ে যাবে । আমরা ফিরছি আর হাতি এসে রাস্তা আটকালো
- চারদিকে কেউ নেই যে বাঁচাবে । হাতি একদম পিষে দিয়ে চলে যাবে ।
জোনাকি বলল , না না , আমাকে নয় , হাতি তোমাকে পিষে দিয়ে চলে যাবে ।
-      জানি ।
পেছন থেকে অশোকের পেট খিমচে ধরে জোনাকি বলে , এই , আমরা দুজন একসঙ্গে আছি ।
তারা দুজন মেটেলি নামের গ্রাম পার হয় । খুবই ছোট গ্রাম । দূর আকাশে লাল সূর্য অস্ত যাচ্ছে । অশোকের মনে পড়ল তার টেবিলের ডায়রীতে লেখা আছে আজ ফাল্গুনের এক তারিখ । আজ সূর্যাস্ত পাঁচটা বত্রিশ মিনিটে । আজকের জন্য পাতার নীচে কোটেশন দিয়েছে , যুদ্ধায় কৃত নিশ্চয়ঃ । তুমি যুদ্ধের জন্য দৃঢ় নিশ্চয় হয়ে দন্ডায়মান হও ।
সে কিছু বলেনা , খালি আঙুল তুলে জলের ওপারে লাল সূর্যটাকে নির্দেশ করে ।
জোনাকি প্রগলভ হয়ে বলে ওঠে , তুমি বিষাদগ্রস্ত হলেও তোমার আঙুলগুলো এখনও খুব সুন্দর  !
সামান্য নীচু হয়ে আঙুলটা দেখে সেজোনাকি বলে , তুমি নিজের হাত দেখে নিলে ।
অশোক ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে চাইতে চেষ্টা করল । জোনাকি বলল , এটাও খুব খারাপ ।
- কোনটা ?
- এইটা , কিছু খেয়াল করা বা না করা । দুটোই ।
 - তোমার দৃষ্টিশক্তি কি সাংঘাতিক আমি জানি , এই বলে অশোক তার বাঁ হাত পেছনে জোনাকির দিকে বাড়িয়ে দেয় ।
গ্লাভস পরা আঙুলের ডগা দিয়ে ছোট্ট পোকাটা তুলে দিয়ে জোনাকি বলে , এটা অনেকক্ষণ ধরে তোমার হাতের ওপর বসেছিল । সরিয়ে দিলাম ... এই এখানে নামবে ?
- এইখানে ?
- ঐ যে একজন লোক কেমন আলপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে , এসো না আমরাও ঐরকম যাই ।
- মাথা খারাপ হয়েছে নাকি তোমার ? এইসব জায়গায় কেউ নামে ?
- নামে না ?
- একদম না । হুট করে একটা কিছু হয়ে গেলে ?
- কি বলছ ? শুনতে পাচ্ছিনা , চেঁচিয়ে বলো। সামনে থেকে কিছু বললে শোনা যায় না ।
অশোক দূরের মাঠের সরষে ক্ষেতের দিকে আঙুল তুলল । দুজনেই দেখল গাছ শুকিয়ে এসেছে । কোথাও হলুদ আভা নেই ।
সামনে বাঁদিকে চারটে গ্রাম্য মেয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে করতে কোথাও যাচ্ছে । ব্লাউজ পরা নেই , শুধু শাড়িডানদিকের হাত পুরো খোলা । জোনাকির মনে পড়ল , আর একদিন এই রাস্তায় এই রকমই কিছু মেয়ে তারা দেখেছিল অশোক সেদিকে তাকিয়েছিল দেখে বলেছিল জোনাকি , আরে মশাই মেয়েদের দিকে অমনি করে তাকালে মার খেয়ে যেতে পারেন ।
এখন তার মনে হল ঐ মেয়েদের সঙ্গে কথা বললে হয়ত অশোকের মন ভাল হয়ে যেতে পারে ।  তাই উচ্ছল হয়ে বলে উঠল , চলো ওদের সঙ্গে যাই । কোথায় যাচ্ছে ওরা গিয়ে দেখি !
- তারপর মার খাই ! তুমি যাও , আমি দাঁড়াচ্ছি , যতক্ষণ না ফেরো ।
- ধূর ! তারচেয়ে মন্দিরে যাওয়াই ভাল । ঐ তো আর একটুখানি ।
বাঁদিকে মেঘের গায়ে চূড়ো ফুটে আছে । বাকি অংশ ঘন গাছপালায় ঢাকা । ওরা মন্দিরের সামনে দাঁড়াল গিয়ে ।
- কি করবে ?  প্রশ্ন করে অশোক ।
- আমাদের একজন মারা গেছে , এখন অশৌচ তাই পুজো দিতে পারব না ।
- খবরদার একথা ভেতরে গিয়ে বোলোনা , মুশকিল হয়ে যাবে ।
যদিও তার মনে হল জোনাকি সত্যি কথা বলছে না । একটু আগেই জোনাকি তাকে বলেছে , সবসময় সত্যি কথা বলা যায় না , না ?
এখন কোন কারণ ছাড়াই অশোকের মনে হল তার পিরিয়ড চলছে । সে কিছু না বলে জোনাকির পরবর্তী আচরণের জন্য অপেক্ষা করে
-      কৈ চলো ওপরে !
মন্দিরে যেতে গেলে সামনের উঁচু রাস্তা ধরে ওপর দিকে উঠতে হয় । সুড়কি ঢালা সরু রাস্তা , দুপাশে ঘন আগাছা । তবে মনুষ্য চেষ্টাকৃত কিছু ফুল গাছও আছে । তারা সুড়কি পথে হাঁটা লাগায় । জোনাকি বলল, তুমি চুপ করে আছো তো , আমি কিন্তু যা বোঝার সব বুঝতে পারছি ।
- কি ?
- তোমার রিচার্য করা দরকার । না হলে খুব নেতিয়ে আছো ।
- কেন আমাকে যথেষ্ট স্মার্ট দেখাচ্ছে না ?
- গুল্লু লাগছে ।
- কি লাগছে ?
- গুল্লু , দীর্ঘদিন চুমু না খেলে ঐরকম দেখতে লাগে ।
দুই গালে নিজের হাত বুলোয় অশোক । অসম্ভব বিরক্তিতে তার মন ভরে যায় । নিজেকে অপদার্থ লাগে । সে লক্ষ্য করেছে প্রয়োজনের সময় জোনাকি খুব সুন্দর ভাবে মিথ্যে বলতে পারে । একদম নির্বিকার । অন্তরীক্ষ ছেনে সে একটা দুর্ধষ্য মিথ্যের জন্ম দিতে চায় এসময় , কিন্তু পারেনা ।
এই জায়গাটায় জুতো খুলে রাখতে হয় । অশোক নিজের জুতো খোলে , জোনাকি বলে , আমি খুলব না ।
- আমি খুলে দেব ?
- এই না না ! এখানে কোথাও জল নেই, হাত ধোব কি করে ? বলতে বলতে নিজের জুতো খুলতে শুরু করে জোনাকি ।
- দেখছি জল পাওয়া যায় কি না ।
- জল নেই , দেখছোনা ফুল গাছগুলো কেমন মরে গেছে ! আগের বার এসে কত ফুল ফুটেছিল দেখে গেছিলাম মনে আছে ?
অশোকের মনে হল তারা শেষ কবে এসেছিল এখানে তার মনে পড়ছে না । ফুলগাছ ছিল কি না তখন তাও সে বেমালুম ভুলে গেছে । বুকের ভেতরটা ভয়ানক মুচড়ে উঠল , সে কি এখন তবে অনেক দূরে চলে গেছে ? নয়ত পুরনো কিছুই মনে পড়ছে না কেন ?  কিছুই ভাল লাগছে না । বড় বেমানান মনে হচ্ছে নিজেকে পুরো চত্বরটা খাঁ খাঁ করছে ।  চারিদিকে কেউ নেই । শুধু মন্দিরের একদম ভেতরে সাধুবাবা বসে আছেন , যেমন থাকেন । বড় ধুনি জ্বলছে , মোটা মোটা কাঠের গুঁড়ি মৃদু আগুনে পুড়ে চলেছে । সেদিকে তাকিয়ে মনে হল অশোকের তাকে কি ঐ আগুন পোড়া কাঠটার মত দেখাচ্ছে এখন ? মাথা তুলতে পারে না । নিজেকে থেঁতো করে দিতে ইচ্ছে হয় ।
- এই মোমবাতি দুটো নাও , ওপরে উঠে জ্বালিয়ে দিয়ে এসো গিয়ে ।
- তুমি যাবে না ?
- না ।
- দু মিনিট দাঁড়াও , সাধুবাবার কাছ থেকে জল এনে দিচ্ছি ।
সাধুবাবা নয় , জল পেল অশোক মন্দিরের চাতালের পেছনে । হাতে করে তাই খানিকটা এনে জোনাকির হাতে ছুঁইয়ে দিল । দু ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভেতরে ঢুকল দুজন । সাধুবাবার কাছ থেকে দেশলাই চেয়ে মোমগুলো জ্বালিয়ে দিল অশোক শুনল জোনাকি বলছে , এই মোমবাতিগুলো অনেকক্ষণ ধরে জ্বলে । দূর থেকেই মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে প্রণাম করে জোনাকি । অশোক ততক্ষণে সংলগ্ন পাশের চত্বরটায় । এখান থেকে নীচের মন্দিরে ওঠার পথ দেখা যায় । দূরে যেদিকে দুচোখ যায় শুধু ঘন জঙ্গল । পাশে এসে জোনাকি দাঁড়াল ।
- বলো এত কেন মন খারাপ ?
- কৈ , ঠিকই তো আছি ।
- না , আমি দেখতে পাচ্ছি । একটা জোক্স শুনবে ?
অশোকের হাসি পায়জোনাকি বলে , না শুনেই যখন হাসছ , তবে তো এই মন খারাপ আমি কি করে ভাল করব ?
অশোকের মন ভারীটা একটু হাল্কা হয়ে যায় । যদিও তার বুকের ভেতরে কুস্তির দমবন্ধ প্যাঁচ , সে বলে ঐ দিকটায় কোনবার যাই না । গিয়ে একবার দেখব ?
- কোনদিকটা ?
-ঐ যে
- ওঃ । ওটা তো হনুমানজীর মন্দির । সেবারে এসে দেখলাম না তৈরী হচ্ছে ? এখন যাবে ?
দুজনে চলে আসে হনুমান মন্দিরে । এখানে পুরো চত্বরটা শ্বেত পাথরে মোজাইক করা । একদম নির্জন কার মূল মন্দিরের ছিটে ফোঁটা শব্দও এখানে এসে পৌঁছয় না । চত্বরটায় পা দিয়েই জোনাকি মেঝের ওপর থেবড়ে বসে পড়তে চায় সঙ্গে সঙ্গে অশোক বলে , না ,পেছন দিকটায় চলো । ওদিকে একটা পুকুর আছে ।
- কি ঠান্ডা গো এখানটা !
- পেছনে এসে দেখো , তোমার ভাল লাগবে ।
- ওদিকে ঠান্ডা নেই আর এখানে এত ?
- আমার হাত ধরো । এখন আমি একবার চুমু খাব । একদম বাধা দেবে না ।
শান্ত হয়ে এগিয়ে এসে জোনাকি অশোকের বাঁ হাতটা ধরে । তাকে প্রায় বাধ্য করে অশোক । তার ঠোঁট বরফে ঢাকা পড়ে গেছে । কান্না পেয়ে যায় তার । শুধু এই জিনিষটার জন্য সে আজ তিন তিনটে রাত ঘুমোতে পারছে না । চোখের নীচে ঘন কালি । অফিসেও কাজে মন বসছে না । তার হাত দুটো জোনাকির পিঠে শক্ত হয়ে বসে যায় । জুতোর ভেতরে দুই পা আর পায়ের আঙুল ফিরে এসে দাঁড়ায় রাজ্যপাট যেখান থেকে শুরু হচ্ছে , সেই সীমারেখায় । এখন শুধু দৃপ্ত পদক্ষেপে সিংহাসন অধিকার । হিজ হাইনেসের সন্নিপাতে জনগন  দন্ন্ডবৎ । অস্ফুট কন্ঠে জোনাকি বলে , কেউ চলে আসতে পারে
-      এখানে কেউ আসেনা ।
-      দাড়ি কাটোনি কেন ?
-      ব্যস আর একবার ।
-      আর না ।
-      আমি তো কোথাও ব্যাথা দিইনি ।
-      আজ থেকে ঘুমোবে ?
-      হয়ত । এত লিপস্টিক কেন ?
-      ঠোঁট নরম থাকে ।
-      এখন তো সব মুছে গেল ।
-      ওতে কিছু হবে না , এগুলোয় অ্যানিমাল ফ্যাট থাকে না ।
-      লং স্টে করে ?
-      আধ ঘন্টা
-      এটা কি ?
-      গরম লাগছে । চ্ছাড়ো
-      একটু আগেও তো বলছিলে ঠান্ডা লাগছে ।
-      তুমিও ঘেমেছোআর না । এবার সরে দাঁড়াও ।
অশোক দেখল জোনাকি ঐ একটুখানির ভেতরেই ওর শরীর থেকে সরে গিয়েছে । বলছে , এবার মন্দিরের আলোগুলো জ্বালিয়ে দাও । কত অন্ধকার হয়ে গেছে ।
ছেড়ে দিল অশোক ওকে ।
নিজেকে যে সরিয়ে নিতে চাইছে তাকে কেমন করেই বা জোর করবে ? নাঃ, স্বেচ্ছায় না চাইলে কাউকে অশোক জোর করতে পারে না ।
জোনাকি বলল , ঐ দেখো , ডানদিকে দুটো সু্ইচ দেখা যাচ্ছে , মনে হয় ওগুলোই হবে ।
ধাঁ করে কি যে হয়ে গেল তার মাথার ভেতরে , এক ঝটকা দিয়ে জোনাকিকে সে নিজের একদম কাছে টেনে আনল ,  খড়ি ওঠা গাল আর শুকনো ঠোঁট জোর করে চিপে ধরল জোনাকির বুকের ওপর ।
-      আমি সত্যিই তোমাকে অন্ধকারে নামিয়ে দিতে চাইছি , আলোর জন্য অনেক পরিচর্যা লাগে , অনুশীলন লাগে ... আমার নেই ওসব
নিস্তব্ধ পরিবেশে খান খান হয়ে সেই আর্তনাদ ঝরে পড়ল , তার মনের ভেতরের ঘন অন্ধকার তাকে গোগ্রাসে গিলছে এখন ।
খুব ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করল জোনাকি , বলল , এই শরীরটার কয়েকটা বিশেষ অংশ ছোঁয়াছুঁয়ি করে ভালবাসার কোন বিশিষ্টতা হয় গো নিখিলেশ ?
মুখোশের মধ্যে রক্তের স্রোত, দেহগন্ধ
তলপেটে শ্রাবণী মৌতাত, অন্ধ
যন্ত্রণার মেঘ, ভেঙে ফেলছে ফুল
নীচে নামলে ঠাণ্ডা, পাথরের চাতাল।।
তারা ধীরে ধীরে মন্দির থেকে নিচে নিমে আসছিল । দুজনে দুজনের হাত ধরে । অশোকের বাঁহাতে হেলমেট , ডান হাত দিয়ে সে জোনাকির একটা হাত শক্ত করে ধরে আছে । পেছনে আধা অন্ধকারে মন্দির । সে আজ বুঝেছে একদিনে আলো জ্বালানো যায় না । দীর্ঘ এক প্রস্তুতি কাজ করে আড়াল থেকে । সব কিছুর অলক্ষ্যে এক নিজস্ব অসি চালনা । দ্রোণাচার্য কেউ নেই শুধু নিরন্তর প্যাঁচ কষে যাওয়া । এবং একক পরীক্ষা শেষে মহোত্তর সেই শূণ্যতা প্রাপ্তিভাবছিল অশোক সেই কি ঈশ্বর প্রাপ্তি ? ওপর থেকে খুব হাল্কা করে ঘন্টা ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল । ভেসে আসছিল সান্ধ্যকালীন বন্দনা গান । মন্দিরের সাধুবাবাই গান করছিলেন । জোনাকি জিজ্ঞেস করেছিল তাঁকে , আপনি কি মৌনব্রত নিয়েছেন ? উত্তর দিয়েছিলেন উনি , দরকার না পড়লে কথা বলেন না ।
সত্যি তো এই বিশ্ব সংসারে অনবরত চতুর্দিকে কত কথা হচ্ছে । এক আধজন যদি চুপ করে বাকি জীবনটা কাটিয়েই দেয় তবে কার কি ক্ষতি ?
- আপনার বয়স কত ? জিজ্ঞেস করেছিল জোনাকি তাঁকে । উত্তর পেয়েছিল নব্বই বছর । অন্য কারুর ছোঁয়া খান না , তবে কেউ ফল মিষ্টি দিয়ে গেলে একটু খান বাকি আর কাউকে দিয়ে দেন ।
- আর কেউ আসে এখানে সাধুবাবা ?
- ভক্তজনেরা আসে । তারা মন্দিরে থাকে । কেউ আশ্রয় চাইলে তো ফিরিয়ে দেওয়া যায় না । তবে মূল মন্দিরে সবাইকে ঢুকতে দিই না ।
- কিন্তু আমরা যে গেলাম ।
- তাতে কি ? তোমরা ভক্ত
- উনি রাত্রে একদম ঘুমাতে পারছেন না বাবা !
- ঘুম হচ্ছে নাতো কি হয়েছে ? কি করবে ঘুমিয়ে ?
- না ঘুমোলে ওনার শরীর খারাপ হবে । এখনই কত খারাপ হয়ে গেছে !
- এ নিয়ে কেন চিন্তা করছ মা ? যা নেই দেহ ভান্ডে তা নেই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে । উনি ওনার মত ।
- তাই বলে উনি ঘুমোবেন না ?
- ভগবানের ঘুম বা জাগরণ বলে কিছু নেই । তুমি ওনাকে ওনার মত ছেড়ে দাও ।
অশোক ভাবল এই এক কথা । তার প্রেমে শরীর থাকবে না । ইন্দ্রিয় থাকবে না । ইঁট বা পাথরের শরীর , যখন খুশী ধূপধুনো দিলেই হবে । পিওর ভগবান ।
জোনাকি বলল , মাফলারটা কানে বেঁধে নাও । বাইক চালালেই ঠান্ডা লাগবে নিজে সে শাল দিয়ে মুড়ে নিল গলা মাথা । অশোক মন দিয়ে তার হেলমেটটা পড়ে নিচ্ছিল ।
- এবার বাড়ির দিকেই যাব তো ?
- কেন আর অন্য কোথায় যেতে চাও
- কোন একটা ডক্টরের কাছে গিয়ে তোমার ব্লাড প্রেশারটা একবার চেক আপ করতে পারলে খুব ভাল হত
হাসি পেয়ে যায় অশোকের । - আরেঃ আমি এখন ভাল আছি ।
- তা আছো । তবে কিনা তোমাকে আমার চাইতে আর ভাল কেউ বোঝে না ।
- তাই কি ?
- তাইই । তাপু তোমাকে ভয় পায় , তোমার নাগাল ও পায় না

আবার সেই একই রাস্তা , সেই ছোট্ট মেটেলি গ্রাম । এখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা । রাত বেশি নয় , সাড়ে ছয় পৌনে সাত হবে । দুপাশে ঘন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে গ্রাম্য আঁকাবাঁকা পথ । জোনাকির আলো জ্বলছে নিভছে কোথাও । শেয়াল দৌড়ে গেল দুটো । পেছন থেকে অশোককে জড়িয়ে ধরে জোনাকি । 

Comments

Popular posts from this blog