১৫। অন্তিম যাত্রা ......।।
সকাল থেকে মেঘলা
ছিল । বাইকটা নিয়ে অশোক বের হয় । কাল পর্যন্ত যতবার সে বাইক নিয়ে বের হয়েছে তাপু
পেছনে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে । বারান্দার গ্রীলটার একদম শেষ প্রান্তে , যেখানে ততটা
আলো নেই , যেখানে মুখের ওপরে শুধু আলো ছায়া খেলা করে সেই প্রান্তে তাপু দাঁড়িয়ে
থাকত । অনেক আগে , প্রায় ছোটবেলার কথাই সেটা , যখন সে বাড়ির বাইরে যেত , বেরনোর
সময় তাপুকে হাল্কা একটা চুমু খেত । তারপর পুটু সোনা জন্মানোর পর একসঙ্গে দুজনকে
আদর । রাতে নাইট ডিউটি পড়লে অসম্ভব বায়না জুড়ে দিত পুটু , বাবার সঙ্গে সেও ডিউটি
যাবে । অশোক তাকে বোঝাত , বাচ্ছাদের রাত্রে বাড়িতে থাকতে হয় , না হলে রাক্ষস
খোক্ষস ধরে নিয়ে যায় । শুনত না পুটু , বায়না করে যেত , সেও যাবে । নিজের ছোট
বালিশটা বুকে ধরে অশোককে বলত , আমি তোমার সঙ্গে প্ল্যান্টে গিয়ে ঘুমবো। তাহলে তো আর রাক্ষস ধরতে পারবে না ? রাত্রে শুতে যাবার সময়
বাবা তাকে গল্প না বললে কিছুতেই তার ঘুম আসে না । তার বাবা রোজ তাকে ছোট্ট একটা
ভূতের ছানার গল্প বলে । বলে সেই ছানাটাই পুটুর সঙ্গে খেলতে আসবে । কিন্তু গল্প
একটু এগোতে না এগোতেই তার বাবা নাক ডাকতে শুরু করে ।
বাবাকে জড়িয়ে ধরে
শুয়ে থাকত সে , নাক ডাকতে ডাকতে বাবা বলে , ঘুমিয়ে পড় ।
-
তারপর কি হল বাবা ?
কোন সাড়া নেই ,
শুধু নাক ডাকা ছাড়া । ঘুম আসতে চায় না পুটু সোনার ।
তাই আজ পুটু
কিছুতেই বাবাকে একলা ছাড়বে না । বালিশ নিয়ে বাবার সঙ্গে নাইট ডিউটি যাবে ।
ছোট বালিশটা নিয়ে
নিত অশোক , তারপর মেয়েকে বলত , ঠিক আছে ,আমি এটা আগে রেখে আসি গিয়ে , তারপর এসে তোমায় নিয়ে যাব । তাপু মেয়ে
নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলে বালিশটা অশোক বারান্দার এক কোণে রেখে দিয়ে প্ল্যান্টে চলে যেত ।
তখন তাকে কেমন দেখতে ছিল আজ আর মনে করতে পারে না অশোক । জীবনের এই ছোট্ট ছোট্ট পদক্ষেপ গুলো এরপর যতই বড় হতে লাগল , তীব্র রোদ এসে পড়তে লাগল , ততই বাড়তে লাগল
গোপনীয়তা । এসে পড়ল লুকোচুরি । একে অন্যকে আড়াল করার প্রবণতা । প্রকাশ করলেই বা কি
? কি এমন ক্ষতি হবে তাতে ? কিন্তু নিজের নিয়মেই তা গোপন থেকে যায় ।
পুটু এখন ঘুমচ্ছে ।
মামার বাড়ি থেকে ফিরে এসে তার মন খারাপ । স্কুল খুলতে এখনও চার দিন বাকি । বেরনোর
সময় একবার ডাকতে গিয়েছিল অশোক , তীব্র বাধা দিয়েছে তাপু । -থাক না ! ঘুমচ্ছে যখন ।
কি করবে ডেকে ? সারাদিন তো একা একাই থাকে ।
ছেলেকে ছুঁতে গিয়েও কুঁকড়ে যায় অশোক । সত্যিই তো সারাদিন পুটু সোনা একাই । তার চেয়ে এই
ভাল , ঘুমচ্ছে যখন , ঘুমোক । আগে দুই তিন বার পুটু বলেছে তাকে , বাবা আমাকে একটা
বোন এনে দেবে ? আজ সুদীপ্তর
বোন হয়েছে ।
তখন তাপু তার বুক আলগা
ছুঁয়ে বসে থাকত , ছেলে পিঠে । অশোক বলত , ওরে ছাড় , লাগছে আমার । সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠত
তাপু , তাহলে দেখ পুটু এরপর একটা বোন হলে তোর বাবার কি হত ?
- কিছু হোত না । বোন এনে দাও না বাবা , .... তারপর নিজেই শুধরে নিয়ে বলত , না না , মা
তুমি এনে দাও বোন ! আমি বোনকে গল্প শোনাব !
- যা না কোন অনাথ আশ্রমে
, অনেক বোন পাবি ।
অশোক চেয়ে থেকেছে তার
বউএর দিকে । আর একটা বাচ্ছা তারা অনায়াসে নিতেই পারে !
ঘন দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার । মায়ার সংসারে এইভাবেই তো মানুষ থাকে । এর হাত থেকে কারুর নিস্তার নেই
। এই অবিনাশী শক্তিই চালিত করেছে সভ্যতাকে । আদিম থেকে আজ পর্যন্ত । যা কিছু তার
বাইরের , তাকে মানুষ এইভাবেই
আপন করে নিয়েছে । যে সৃষ্টি হচ্ছে , যে বহমানতা চলে আসছে , তা ঐশ্বরিক হোক বা
প্রাকৃতিক ,সংঘাত নেই কোন সেখানে । এইটাই ভালবাসা । অথচ সৃষ্টির পর কি ভীষণ লড়াই ,
যুদ্ধ , সংঘাত । যেন মানুষের জন্মই হয় এই লড়াই লড়বার জন্য । তার কি আনন্দ হয় ?
নিশ্চই হয় । না হলে তাপুই বা তার স্বামীর দিকে চেয়ে থেকেছে কেন ?
কিছু বলে না অশোক । সে
জানে তার নিজস্ব উদাসীনতার জন্য এমন ভয়ংকর বাঁধনে আবারও জড়িয়ে পরা প্রায় অসম্ভব ।
এই বারবার জড়িয়ে পড়াটাও একটা যুদ্ধ । সেই মানসিকতা তার মধ্যে নেই ।
এতদিন সে উদাসীন ছিল । পৃথিবীতে যা যা হচ্ছে তার ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলেও সে সব
স্পর্শ করে নি তাকে । কিন্তু এখন সে প্রবল ভাবে একাকী হয়ে যাচ্ছে । সমস্ত তুচ্ছ
ঘটনাও যেন হুড়ুমুড়িয়ে তার গায়ে এসে পড়ছে । নিস্তার নেই । এখন প্রত্যেকটা ঘটনাই
প্রবল দাবী করছে হৃদয়ের এক একটা টুকরো ।
বাইক নিয়ে বের হয় অশোক ।
তাপু তাকে দই মিষ্টি কিছু ফল আর চিঁড়ে এনে দিতে বলেছে । আজ শিবরাত্রি । ফাল্গুন
মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী । ত্রয়োদশী আর চতুর্দশীর রাত্রে শিবলিঙ্গ প্রথম প্রকাশ
পেয়েছে । এইদিন শিব আর পার্বতীর বিয়ে হয় । বিশাল ঝঞ্ঝাট হয়েছিল সেই বিয়েতে ।
পার্বতী তবু শিব ছাড়া কারুর গলায় মালা দেয় নি । মেয়েরা শিবের মত স্বামী চেয়ে ভগবানকে
দুধ গঙ্গাজল ঘি এইসব দিয়ে চান করায় । তারপর পুজো করে । আবার এমনও বলা হয় যে উত্তর
গোলার্ধের আকাশে ঐ দিন গ্রহ নক্ষত্রের সংস্থান এমনি যে ঐদিন মানুষের সমস্ত ধরনের
শক্তি জাগ্রত হতে পারে । সব পাপ থেকে মুক্তি পায় সে , মানে যত রকম মানসিক গ্লানি
আছে কেটে যায় সব ।
অশোক ভাবল ওর মোক্ষ্লাভ
হয়ে গেছে । মুক্ত ও । সেদিন
দুপুরেই তাপুকে মুক্তি দিয়ে দিয়েছে
। জোনাকিকে দিয়েছে একটা বিশেষ উপহার । সেদিন সন্ধ্যেয় বাইকে চেপে ফিরে আসবার সময়
একটা হাত সোজা ছড়িয়ে দিয়েছিল আকাশের দিকে । তখন বৃষ্টি পড়ছিল হাল্কা । মুঠো ভরে তুলে এনেছিল সেই সান্ধ্যকালীন
শীতলতা আর দু ফোঁটা বৃষ্টি । খুব আন্তরিক ছিল সেই দেওয়া । ওখানেই তো মিটে গিয়েছিল
পৃথিবীর সমস্ত দেনা পাওনা ।
এখন এই সকালে যখন গোটা
পৃথিবীর আকাশ জুড়ে মেঘ , পুষ্পবৃষ্টির মত টলটলে জলবিন্দু , খুব ভাল লাগে তার । গত
রাতে তাপু খবর শুনছিল টিভিতে, চার পাঁচটা বাক্য কানে এসেছিল তার । গাঙ্গেয়
পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় দুটো ঘুর্নাবর্ত এসে হাজির হয়েছে । বঙ্গোপসাগরে রয়েছে একটা
উচ্চচাপ বলয়ও । তার ফলে দখিণা বাতাসের পাশাপাশি এই ঝড় বৃষ্টি । জোলো হাওয়ার জন্য
ভোরবেলায় ঘন কুয়াশা । এখন দিনের তাপ যত নামছে তত জ্যোৎস্নার মত আলো এসে পড়ছে
পৃথিবীর মুখে । তার বুকের ভেতরটা শান্ত হয়ে গেছে । সমস্ত শরীর জুড়ে মায়াবী স্পর্শ
। ভিজে সজনে ফুল আর আমের মুকুলের গন্ধ তার মগজকে আছন্ন করে দেয় । তবু এই আছন্নতার
মধ্যেও সে দই মিষ্টির কথা মনে রাখে । ওগুলো দিয়ে কার মঙ্গল কামনা হবে জানা নেই ,
তবু কর্তব্যটা সে করবে । জিনিষটা কিনে ঘরে দিয়ে আসতে হবে ।
সব কিছু কেনে এক এক করে
। ঘরে দিতে গিয়ে দেখে পুটু সোনা তখনও ঘুমোচ্ছে । তবু তার মশারীর কাছে গিয়ে বলে ,
টাটা ।
তাপু বলল , কিছু খেয়ে
যাবে না ?
-
নাঃ । খিদে নেই । পরে খেয়ে
নেব ।
আর কিছু বলেনা তাপু ।
তার ঠাকুরের সামনে সে পুজোয় বসেছে । মোমবাতি জ্বালিয়েছে । পদ্মাসনে
বসে মেরুদন্ড সোজা রেখেছে ।
চোখ বন্ধ , তাকায়নি অশোকের দিকে । মনে
মনে বলে , ঠাকুর আমায় শক্তি দাও ।
যেন আমি নিজের শক্তিতে সব বাধা দূর করতে পারি ।
কয়েকটা নির্বাক মোম আর পাথরের
মুর্তি সাক্ষী থাকে সে সবের । বলে চলে তাপু একমনে । দুই চোখই তার বন্ধ ।
জোনাকি তখনও নিজের
বিছানা ছাড়েনি । এখন আর তত শীত নেই । পাতলা একটা চাদর আছে শুধু । মেয়ে পাশের ঘরে
গভীর ঘুমে , আর চন্দন নিয়মমত হাঁটতে গেছে । রোজকার অভ্যেস
, অর্ধেক পৃথিবী হেঁটে বাড়ি ফিরবে ।
দেরী করে ।
কাজের মেয়ে আসবে আরো একঘন্টা পর , তাই তার অত তাড়া নেই ।
এখানে এই বিছানা থেকেই জানলা দিয়ে দূরের চিমনি দেখা যায় ।
আজকের এই মেঘলা সকালে চিমনির ধোঁয়া ধবধবে সাদা ।
শুয়ে শুয়ে দেখে সে এক ঝাঁক উড়ন্ত বক । অনেক উঁচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ।
নিজের মনের মধ্যে কি একরকম অনুভূতি হয় ।
নিজের
অজান্তে নাভির চারপাশে হাত ঘুরতে থাকে।
এই
দেহের খোলস শান্ত হোক। ইচ্ছে হয় এই শরীরটা অন্য রকম হয়ে যাক ।
শুকিয়ে যাক বুক , একটা ভূঁড়ি হোক , চোখের নীচটা ফুলে যাক কি কোণে কালি জমুক ।
এই রকম ইচ্ছে ।
আর ইচ্ছে হয় এবার বার্ধক্য নেমে আসুক ।
বেশ কিছু চুল তার সাদা হয়েছে , কিন্তু
মেনোপজ আসছে কই ? অধীর অপেক্ষায় থাকে সে ।
অশোকের কথা মনে হয় তার প্রতিটা মুহূর্তে
। মনে সে
তার একটা আঙুল এদিকে বাড়িয়ে রেখেছে ।
সুদূর দাক্ষিনাত্যে এবার চলে যাবে সে ।
হবে কি তার সেই কাঙ্খিত দিগ্বিজয় ?
অশোক এতকিছু জানে না ।
দেখল জ্যোৎস্নার মত আলোয় সামনে একটা মায়াবী গাছ ।
অসংখ্য সাদা ফুল ঝুলে রয়েছে ডালে ডালে ।
কি ভাবল সে জানে না , তাই একটুক্ষণ থেমেই আবার চলতে শুরু করল ।
জলে ভেজা বাতাস তার নাকে মুখে এসে খেলা করে ।
তার মনে হয় সমস্ত সমুদ্র থেকে , সমস্ত নদী থেকে , সমস্ত পর্বত শৃঙ্গ থেকে ছুঁয়ে আসা এই বাতাস সোজা এসে তাকে সঙ্গে
করে কোথায় নিয়ে
চলেছে । বাইকটাকে
আরও জোরে ছোটায় সে ।
আপাত উদ্দেশ্যহীন সেই ছোটা ।
পৃথিবীকে একদম পেছনে ফেলে ছুটে এগিয়ে যেতে চায় ।
অনন্ত কোথায় জানা নেই , তবু ছুটছে ।
রাস্তার দু পাশেই ট্রাক ছুটে
যাচ্ছে । জিটি রোড বরাবর চলছে খোঁড়াখুঁড়ি । রাস্তার অর্ধেক
বন্ধ । কোথাও
লেন বাড়ছে , কোথাও ওভার ব্রীজ ।
ট্রাকের চাকা থেকে উড়ে আসা ধুলো তার চোখে মুখে পড়ে ।
কিছু কাদা ছিটকে এসে লাগে জুতোয় ।
কিছুক্ষণ আগেও বৃষ্টি হয়ে গেছে এখানে ।
সে দেখল উল্টোদিক থেকে অট্টহাসি হাসতে হাসতে একটা ট্রাক এগিয়ে আসছে তার দিকে ।
দু পাশে দুটো চাকার মাঝখানে ভগবানের মত ড্রাইভার আর খালাসী দুলছে । দুটো চাকার
মাঝখানে কতটা দূরত্ব সে বুঝতে চেষ্টা করে । নিজের বাইকের চাকার তলা দিয়ে নিচে
রাস্তাটা পিছলে পেছনে চলে যাচ্ছে । ঐ পিছলে চলে যাওয়াটার মধ্যে কি শান্তি !
ঠিক সেই মুহূর্তে কি হল বুঝতে পারে না সে । বাইকটা নিজে নিজেই উল্টে
প্রায় কাত হয়ে যায় রাস্তার ডিভাইডারে । ট্রাক ড্রাইভারের মুখ নিঃসৃত অমৃতবানী সে
বুঝে উঠতে পারেনা । হাতে একটু চোট লেগেছে । বাইকটাকে টেনে তোলে সে। হাসতে থাকে ,
আপন মনেই বলে, শালা ! সামনের
রাস্তাটা নদীর মত একলা পড়ে আছে । ট্রাফিক পুলিশের মত সে হাতের ঈঙ্গিত করে , সময়
হয়ে গেছে , চল্ এবার । কিন্তু রাস্তাটা চলল না । সে আবার স্টার্ট দিল বাইকে । মনের
খুশীটা আরও জোরদার হয়ে গেল । রাস্তার বহমানতা , বাতাসে নদীর শীতলতা , দিনের আকাশ
রাত্রির মত হয়ে যাওয়া । বারবার তার
মনে হচ্ছিল এইরকম সোজা চলে যাবে , তাকাবেনা কোন দিকে । এইরকম সোজা গেলে কি মহান
সেই উত্তরের অরণ্য ? এইরকম অনেক দিন আগে একবার সে চলে গেছিল অনেকটা । দারুন এক
উত্তেজনা হচ্ছিল সেদিন । তার ডানদিকে ছিল লাল সূর্য । কিন্তু বেশ কিছুটা চলে যাবার
পর লোকজনের ভিড় ব্যস্ততা এসব দেখে সে ফিরে এসেছিল আবার ।
এখন তার পেছনে ফেরার কোনো টান নেই ।
পুটু সোনার মুখটা মনে পড়ল একবার , একটা দুধ দুধ গন্ধ নাকে পেল , কিন্তু ঐ পর্যন্তই
। ভেজা বাতাসে ঘ্রাণ মেখে নিতে নিতে আরও জোরে ছুটতে শুরু করে সে । প্রায়
পক্ষীরাজের মত উড়তে উড়তে কালিন্দী নদীর ব্রীজ পার হয় । বাঁদিকে হজরত সঈদ গাউস-ই বেঙ্গল
সামসুদ্দিন শা ওয়ালির মাজার । সুন্নি
মুসলমানদের । গত বছর সে আর জোনাকি একবার
এসেছিল এখানে । বলেছিল, জোনাকি , এসো আজ
আমরা কলমা পড়ি ।
কলমা জিনিষটা কি সে ঠিকঠাক জানত না
তখন । এখন সে জানে কলমা তায়েব , কলমা সাদাত , কলমা তৌহীদ , কলমা আসতাফতার , কলমা
রাডে কুফার ।
অশোক উচ্চারণ করে আসতাখফিরুল্লা
রাব্বি মিন্ ,কুল্লে জামবিন আজনাবতুহো আমাদান্ .... আমি ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি , হে
প্রভূ জ্ঞানত বা অজ্ঞানত , গোপনে বা প্রকাশ্যে আমি যে যে পাপ করেছি .... সমস্ত পাপ কেবল তুমিই জানো , কেবল তুমি ।
সে জিটি রোড ছেড়ে বাঁদিকে বাঁকে । ন’মাস আগেও সে এই রাস্তায় এসেছিল । তখন ভেতরে
ঢোকেনি , আজও না , বাইরে দাঁড়ালো কিছুক্ষণ ।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সূর্যাস্তের লাল পথ ধরে । বাজারের মধ্যে দিয়ে পথ । এস
টিডি বুথ , মাংসর দোকান , সস্তার হোটেল এসব ছাড়িয়ে থানা , প্রাইমারী স্কুল । সে সব
পেছনে রেখে সে আরও এগিয়ে চলল । তাকে এখন ঠিক রক্ত গোলাপের মত দেখাচ্ছে ।
হঠাৎ সে দেখতে পেল সোঁদাল গাছটা ।
গতবার এসেছিল যখন তারা একসঙ্গে , তাদের
মাথা ছুঁয়ে যাচ্ছিল হলুদ ফুলের ঝুরি । আজ সে গাছে ফুল নেই , বরং নিচে কি সব আগাছা
জন্মেছে । সেখানে ফুল ফুটে আছে অজস্র ,
বাতাসে মাথা দোলাচ্ছে তারা । এখান থেকে জমি ঢালু হয়ে সোজা মিশে গেছে নদীর দিকে ।
সে ডানদিক ধরে এগিয়ে যায় । পেছনে একটা শব্দ হল, সে খেয়াল করে না ।
ভেজা বাতাসে বেশ কাঁপুনি ধরিয়ে দেয় । হেলমেট খুলল, চুল ভিজেছে খানিকটা ।
পেছন থেকে কে যেন বলে ওঠে , এটা কি
করলিরে শালা ? ইন্ডিকেটর, হাত দেখানো কিছুই
না , সোজা মেরে দিলি ?
বেশ বুঝতে পারে তার মুখের দিকে একটা
ঘুঁষি এগিয়ে আসছে । তবুও নিজের জায়গা ছেড়ে একপাও নড়ে না সে ।
আর একটা ছেলে বলে , কি কি আছে দেখ তো
? না পেলে ফাঁক করে দে, শুয়োরের
বাচ্চাটাকে।
মুখের মধ্যে সে রক্তের নোনতা স্বাদ পায়। তুবুও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে । ছেলেটা বলে
, আয় .....
তার মনে হয় এরা তাকে এভাবে ডাকছে কেন
? আজ কি চোখে কাপড় বেঁধে অন্ধযুদ্ধ ?
সটান একটা লাথি এসে পড়ে তার তলপেটে ।
কাদা মাখা জমির ওপরে পড়ে যেতে যেতে দেখতে পায় পাশের ঝোপে একটা ছোট গাছের ডালে
প্রজাপতির ডিম ঝুলছে ।
সে প্রস্তুত হয় ।

Comments
Post a Comment