৫। চরাচর সকলই মিছে .........।।
ট্রেনের কথা উঠলে আম বাঙালীর মনে পড়ে কাশফুলের মধ্যে দিয়ে অপু দুর্গার ছুট
ছুট । অশোক নিজে যখন ছোট ছিল , স্কুল থেকে ফেরবার সময় সে গার্ডের কম্পার্টমেন্টে
উঠে বাড়ির স্টেশনে নামত । তার বন্ধুর বাবা ট্রেনের গার্ড ছিলেন , সেই সুবাদে অন্য
গার্ডরা কাকু । ভিড়ে ঠাসা ট্রেনে যখন সবাই ওঠবার জন্য ঠেলাঠেলি করছে , তারা কয়েকজন
বন্ধু নিশ্চিন্তে উঠে পড়েছে গার্ডের কম্পার্টমেন্টে । সাদা পোষাক পরা গার্ড দরজা
দিয়ে ঝুঁকে ভিড় দেখতে দেখতে যখন বুঝত আর কাউকে নেওয়ার নেই , তাদের বলত , নাও এবার
বাজাও । পায়ের কাছে এয়ার হর্ণের গোল ভালব । পা দিয়ে জোরে চাপলেই জোর শব্দ ওঠে ।
তিনটে মাত্র স্টেশন । ফলে একবারই হর্ণ বাজানোর সুযোগ । বাকি দুবার অন্য দুজন ।
অন্য কেউ হর্ণ বাজালেও ভাল লাগত । আর নিজে যখন পা দিয়ে সেই ভালব চাপত এক আজব
কম্পাঙ্কে পায়ের পাতা বেয়ে পেট নাভি বুক গুড়গুড় শব্দে কেঁপে উঠত । এজন্য ট্রেনের কথা
উঠলেই তার মনে পড়ে শিরশিরে সেই কম্পাঙ্ক আর এয়ার হর্ণ । অপু দুর্গার কথা তার মনে
পড়ে না ।
একদিন স্কুল ছুটির পর প্ল্যাটফর্মে এসে এক অদ্ভূত ট্রেন দেখতে পেয়েছিল অশোক । ট্রেনটা কালো
রঙের আর মাথা দিয়ে গলগলিয়ে ধোঁয়া বেরচ্ছে
। ইঞ্জিনটাও বড় । উঁকি দিতে দেখতে পেয়েছিল বেলচা করে একজন কয়লা দিচ্ছে । বন্ধুকে
নিয়ে একটুক্ষণ নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেওছিল কিন্তু কোন লাভ হয় নি । কোন দূর
দেশের ড্রাইভার তাদের ট্রেনে তুলে নেয় নি । একটা সম্পূর্ণ অচেনা শব্দে দীর্ঘক্ষণ
হর্ণ বাজিয়েছিল সেই ট্রেনটা । যে শব্দ মাটি কাঁপিয়ে বুকে এসে ধাক্কা মারে । তারপর
তাকে টলিয়ে দিয়ে লাবডুব শব্দ করতে করতে ক্রমশ গতি বাড়িয়ে কোথায় যে মিলিয়ে গিয়েছিল
। ঐ ট্রেন সে আর কোনদিন দেখতে পায় নি ।
জোনাকি যেদিন বলল - আমার না একদিন
ট্রেনে চেপে ধানবাদ যেতে খুব ইচ্ছে করছে , শুনে অশোক মনের মধ্যে একটা ট্রেনের হর্ণ
বাজিয়ে চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেয়েছিল ।
সমস্ত নৈশব্দ আড়াআড়ি ভেঙে কু ... ঝিক ... ঝিক একটা শব্দ ।
না আগে তারা কেউই কোনদিন ধানবাদ যায়নি । একদুপুরে হঠাৎ তাকে জোনাকি ফোন করেছিল ।
বলেছিল আমি আসানসোলে বন্ধুর বাড়ি এসেছি । তুমি পাঁচটার মধ্যে এখানে চলে আসবে ।
তারপর আমরা একসঙ্গে বাড়ি ফিরব ।’ দুপুর তখন বিকেলে গড়াচ্ছে । আসানসোল যাবার কোন
ট্রেন নেই । খানিক পরে সে জোনাকিকে ফোন করে , হ্যালো !
জোনাকি বলল - তুমি না এলে
আমি আর কাউকে ডেকে নেব । বলেই ওপাশে লাইন কাট । প্ল্যাটফর্মে এসে অশোক দেখল
শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস পাঁচটায় ।
আবার ফোন করল সে - আমার আসানসোল
পৌঁছাতে ছটা বেজে যাবে ।
-
যাক । ছটা সাতটা আটটা বেজে যাক । আমি অপেক্ষা করব ।
পাঁচটার ট্রেন পাঁচটা সাতান্ন সেকেন্ডে প্ল্যাটফর্মে এলে প্রায় অর্ধেক
যাত্রী নেমে পড়াতে কম্পার্টমেন্ট খালি এবং অশোক খুব অবাক হয়ে দেখল বিনা আয়াসেই সে
জানলার ধারে একটি সিট লাভ করে ফেলল । কিন্তু গোটা রাস্তাতে সে একবারও ট্রেনের
হুইশল শুনতে পেল না । বাইরে মাঘী সন্ধ্যার হালকা
কুয়াশা । স্মৃতির মত আবছা গাছপালা উল্টো দিকে চলে যাচ্ছে । মনের ভেতরে অদ্ভূত অদ্ভূত সব কথা বেলুনের মত ভাসছে ।
গত দুমাস ধরে তারা ফোনে পরস্পর কথা বলছে । কখনও দশ মিনিট কখনওবা কুড়ি পঁচিশ
। সময় পেলেই । এই তো গত সপ্তায় জোনাকি একটু
রাতের দিকে তাকে
একবার ফোন করেছিল । তখন প্রায় সাড়ে দশটা ।
কি করে যে মেয়েরা এমন সাবলীল হয়ে মিশতে পারে তার সহজাত নির্লিপ্তির জন্য সে
কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না । জোনাকি ফোন করলে আজকাল তার মুখে কেমন একটা
বোকাটে হাসি কোথা থেকে চলে আসে । চোখের
ভাবও মুহূর্তে বদলে যায় । সদ্য যুবকের মত । সামনে তাপু থাকলে অবস্থা
আরো কঠিন । খুব মামুলি কথারও তখন সহজ জবাব সে দিতে পারে না । হুঁ হাঁ ছাড়া আর কিছুই বেরয় না । বেশি শব্দ উচ্চারণ করলে কাশফুলেরা বাতাসে মাথা
নাড়ায় । একশো লাল পলাশ থোকা হয়ে ফুটে ওঠে – পেছনের ফটোগ্রাফী দ্রুত যায়
বদলে ।
পলাশ যেখানে গাছের নীচে
পাইপের
লিক এক পাহাড়ী জলস্রোত
ফুল
আর জলের সম্পর্কের মধ্যে
যখন
আমি হুড়মুড়িয়ে পড়ি
তোমার
মুখের মত করুণ এক ছবি
আমার লাবডুব নদী,
বাতাস এখন ঠিক এখানেই বসে ।
এক লহমায় ঘড়ি চলে যায় মহাকাশে । নদীর চিকচিক ঢেউ তার মন নিয়ে লোফালুফি খেলে
। উদাসীনতার সর কেটে গিয়ে টলটলে রুপোলি জল বেরিয়ে আসে । মুখের দিকে তাপু হাঁ করে তাকিয়ে থাকে । কে , জানতে চায়
না । অশোক ভাবে জোনাকি কি করে বাড়ির লোকজনদের সামাল দেয় ? আসলে ফোনের শব্দ তখন
কমানো থাকত না । এস এম এস গুলোও আসতো প্ল্যাটফর্ম কাঁপিয়ে । যদিও সে সবই কাজের
কথাতেই ভর্তি । অশোক ফোন ভাইব্রেশনে রাখা শিখল তারপর । মোবাইলে না পেলে তার অফিস
তাকে ল্যান্ড লাইনেও ফোন করে নেয় । আর এইরকম অফিস কল তার মাঝরাত্রেও আসে । ঘুমনোর সময়ও ফোনের মুঠো আলগা হয়না। ওসব তার গা
সওয়া । কারখানায় কোন প্রবলেম হলে তাকে মাঝরাত্রেও ছুটতে হয় । এবং যতক্ষণ না
সমস্যা মিটছে যন্ত্রপাতির সঙ্গে এক তরফা লড়াই তাকে লড়ে যেতে হবে । তারপর বাড়ি
ফিরতে ভোররাত ।
সেদিন অত রাত্রে যখন ফোন বেজে উঠল , অশোক ভাবল প্ল্যান্টের কল । কোন মেশিন বিগড়েছে সিওর । দৌড়ে এসে রিসিভ করল
কলটা ।
-
কি করছিলে ?
-
আপনি ? এত রাত্রে ?
-
ফোন রেখে দেব ?
-
না না ! অশোক প্রগলভ হতে চেষ্টা করে ।
জোনাকি
জিজ্ঞাসা করে , তোমার বৌ ঘুমোচ্ছে ?
- হ্ হ্যাঁ !
তুমি কি করছিলে ?
- এই যে আপনাকে
ফোন করছি !
বেশ তুমি আপনির খেলা চলে , ছোঁয়াচে অসুখের মত সংক্রমিত হয় সে বেশ বুঝতে
পারে যদিও সে সঠিক জানে না বাতাসের মধ্যে ট্রেনের হুইশলের শব্দে ওঘরে তাপুর ঘুম
ভেঙে গেল কি না । বুকের ভেতরে
তার ঘাম হয় এবং তার অনুভূতি তাকে বলে দেয় জোনাকির
কন্ঠস্বর তাকে ধীর লয়ে উজ্জিবিত করছে । এদিক থেকে সে জোনাকিকে প্রশ্ন করে - তোমার বাড়ির সবাই ঘুমিয়েছে পড়েছে নিশ্চই ।
- নাঃ কৈ আর ঘুমোল ? সবাই টিভি দেখছে । আপনি কি
করছিলেন বললেন নাতো ?
- ওঃ আমি তো পড়ছিলাম , মিলান কুন্দেরা। ইম্মর্টালিটি। অশোক কান পেতে
শোনবার চেষ্টা করল বাতাসের কম্পন এবং শীতের কুয়াশার মধ্যে ট্রেনের চাকার শব্দ ।
এখন এই চলন্ত ট্রেনে বসে সে গভীর ভাবে ভাবছিল সেদিন রাত্রের কথা । সে
জোনাকিকে ফোন করে - তুমি এখন
কোথায় ?
-
তাড়াতড়ি এসো , আমি একা প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছি । কি
অন্ধকার !
অশোকের ধারনা নেই আর কতক্ষণ তাকে এইভাবে ট্রেনে বসে থাকতে হবে । সে ঘড়ি
দেখে । তার মনে পড়ে সেদিন রাত্রে ফোনে কথা বলার কয়েকদিন পর
তারা দুজনে একসঙ্গে নদীর ধার থেকে ফিরছিল । তখন প্রায় সন্ধে । রাণীগঞ্জের কাছে মেজিয়া , সাতুরি
যাবার রাস্তায় পড়ে দামোদর । একটা
রোড ব্রীজ , পাশেই ট্রেন যাবারও ব্রীজ । একটা ট্রেন যাচ্ছে ব্রিজ কাঁপিয়ে । ঠিক তার
পেছনে ঝাপসা সূর্য আকাশ রাঙিয়ে বসে আছে । তারা ছিল রোড ব্রীজের ওপর । ট্রেন যাবার
আগে তারা দামোদরে দেখতে পাচ্ছিল কার আ্যন্ড টেগোর কোম্পানীর কয়লা বোঝাই বড় বড় বজরা যাচ্ছে
সার সার পাল তুলে । অতি মন্থর তাদের গতি । শীতেই ভাল জল নেই তো গ্রীষ্ম । গ্রীষ্মের খরতাপে দামোদর শুকিয়ে গেছে । চন্দ্র
সূর্য জোয়ার ভাঁটায় সে নিয়মের কোন পরিবর্তন নেই । ফলে কলকাতায় কয়লা পৌঁছায় না ।
এজন্য তৈরী হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রেলওয়ে । এরা হাওড়া থেকে সিয়ারসোল পর্যন্ত
রেল লাইন পাতল । অশোক দেখতে পেল কার টেগোর কোম্পানীর কয়লা নিয়ে
স্টীম ইঞ্জিন আগুনের পাখির মত ছুটে চলেছে । আর সে বসে আছে সেই ট্রেনে । বর্ষার
দামোদর ভয়ংকরী । বন্যার স্রোতে রাঢ় ভাসছে । ঘুম ভেঙে উঠেছে পাগলিনী । ট্রেন পথও জলে ভাসে । অশোক মনে করতে চেষ্টা করে
ডিভিসি কি দামোদরের জীবনকে পুরো বদলে দিতে পেরেছে ? জল শুকিয়ে নদীর বুকে
কোথাও বন জঙ্গল সমৃদ্ধ চর । ভরা বর্ষাতেও সেখানের মানুষজন আজকাল লুকিয়ে পোস্ত চাষ
করে । সামনে কলাগাছে
ঘেরা খড় বাখারির আস্তানা । মরশুমে ডিভিসির ছাড়া জল চরের ,যার স্থানীয় নাম
মানা , দুপাশ দিয়ে
বয়ে চলে যায় বাধ্য ছেলের মত । সেই জলে মাইথন থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত কারখানার নোংরা তেল ।
রোদ পড়লে গোলাপি বেগুনি রঙ পাশাপাশি ফুটে ওঠে । এটা কি দামোদরের দ্বিতীয় জীবন ?
কেমন এই জীবনটা ? অশোক ভাবল প্রেম আর প্রয়োজন । কয়লার বজরা নদীতে আটকে গেছে বলে কি
ট্রেনের প্রয়োজন ? না কি এর মধ্যে ব্যবসা আছে সংঘাত আছে ? বা ট্রেন নামক নতুন আবিষ্কারের প্রতি প্রেম? অল্প অল্প
ঈর্ষা আছে ? যা ক্রমশ প্রবলতর হবে ? সেই
সংঘাতে বজরা হারিয়ে যাবে । সেখানে ঢুকে পড়বে অন্য ব্যবসা ?
জোনাকি আবার প্রশ্ন করে - তোমার আর কত
দেরী ? আমার খুব ভয় করছে ।
আবার ঘড়ি দেখে অশোক । একটা উত্তেজনা হচ্ছে তার ভেতরে । জোনাকি তার ওপর
নির্ভর করতে শুরু করেছে । সে না পৌঁছান পর্যন্ত অসহায় বোধ করছে । বদলে অশোক কি
এবার নিজের অধিকার প্রয়োগ করবে ? বলবে , এই ত , আমি আসছি ! ঐ একটুখানি তো কথা
কিন্তু কত কাছাকাছি ! হাল্কা ব্যথা বোধ করল সে । তলিয়ে দেখল নিজের মনের ভেতর । নাঃ
কোন অধিকার বোধই তার তৈরী হয় নি । কোথাও পেল না খুঁজে তাকে । বিহারী নাপিত তার চুল
কাটতে কাটতে বলেছিল , কি আপনি বিলকুল সাফা সুতরা থাকেন ? একটা মুচ রাখুন ।
- মুচ থাকলে কি হবে ?
- আদমী লোগের মুচে থাকলে
তাকে দেখে জেনানা ঘোঙ্ঘট দেবে , থোড়া শরম করবে , ভরসা ভি করবে !
অশোক ভাবে সে ততদূর পুরুষ মানুষ হতে পারলনা । ঠিক যতদূর হতে পারলে পৌরুষ
আহত হয় ।
-
আপনা লোকের ওপরেই ত রাগ হোবে !
জোনাকিকে সে এখনো নিজের বলে ভাবতে পারছে না । তৈরী হচ্ছে না কোন অধিকার বোধ
। ট্রেন যখন
আসানসোল থামল , প্ল্যাটফর্মে নেমেই অশোক কাউকে দেখতে পেল না । বেশ দূরে একটা শূণ্য
চেয়ারে একা জোনাকি বসে আছে । মুখের ওপর তার আসানসোলের ম্যাপ উড়ে বেড়াচ্ছে । আলো আঁধারী
প্ল্যাটফর্ম আর আশপাশ, সব মিলিয়ে তার অপেক্ষার ভঙ্গি সত্তর দশকের
সিনেমার নায়িকার মত । শক্তিপুঞ্জ
প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেল । শুনশান সবদিক ।
পঞ্চকোটের
জমিদারদের দেওয়া এই জায়গায় দাঁড়িয়ে সে
ধূপের একটা হাল্কা গন্ধ পেল । আর ঠিক তখনি কবরখানার ঘন্টাধ্বনির মত দিগ্বিদিক
কাঁপিয়ে তার মোবাইল বাজল , শুনছ ? তোমার বাড়ী ফিরতে খুব কি দেরী হবে ?’’
তাপু !
- সকালে ঠিক
খেয়াল করিনি , চাল কমে এসেছে । ফেরবার সময় নিয়ে এস মনে করে । জোনাকি সামনে এসে
দাঁড়িয়েছে - অফিস কল ?
তার কন্ঠস্বরে ঈষৎ ঝাঁঝ ।
প্ল্যাটফর্মে মাথার ওপরে কয়েকটা চামচিকে উড়ছে । আসানসোল অনেক পুরোন স্টেশন
কাজেই এখানে চামচিকে বাদুড় থাকা
অস্বাভাবিক নয় । ডাউন ট্রেন সেই আটটা যদি রাইট টাইম থাকে তো । তার মানে দুর্গাপুর পৌছাতে নটা, বাড়ি সাড়ে নটা । অশোক ভয় পায় । চাল তাপু আর চামচিকের মধ্যে সে প্রবলভাবে
সামঞ্জস্য আনতে চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না । দেরী হলে বাড়িতে তুলকালাম কান্ড ঘটে
যেতে পারে । তাপু জানে সে আটটার মধ্যে ঘরে ফেরে । সে ফিরলে তবে তাপু একটু সামনের
মার্কেটটায় টুকটাক জিনিষ কিনতে যায়। দু একজন বান্ধবীর সঙ্গে দেখা টেখা হয় সেখানে।
অশোক ততক্ষণ ঘরে ছেলেকে একটু পড়াটড়াগুলো
দেখিয়ে দেয় । অন্তত এতদিন এটাই হয়ে এসেছে । তাপুকে কি একবার ফোন বলে দেবে
যে জরুরি কাজে সে আসানসোলে এসেছে , হঠাৎ ? রাত্রে ফেরবার সময় হোটেল থেকে কিছু নিয়ে ফিরবে । তারা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে টিকিট কাউন্টারের
দিকে যাচ্ছে । সে আড়চোখে জোনাকির দিকে চাইল । চাওয়া মাত্রই জোনাকি বলল - বাড়ীতে বলে
আসোনি নাকি ?
- তুমি বলে এসেছো ?
- এসেছি তো । বলেই এসেছি
আজ দেরী হবে ।
- আমি না এলে কাকে ডাকতে
? মরিয়া হয়ে প্রশ্নটা করেই ফেলল অশোক ।
- আমার একজন প্রেমিক আছে, জাননা ? তাকেই ডাকতাম ।
- সে আসবে ঠিক জান ?
জোনাকি মোবাইলটা দেখিয়ে বলল - এক্ষণি ফোন
করলে চলে আসবে । ও খুব কাছেই থাকে ।
অশোকের মনের মধ্যে মুহূর্তে ঈর্ষার
দমবন্ধ অবস্থা । অদৃশ্য লোকটাকে সে দেখতে পেল সামনেই । উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্ম
কাঁপিয়ে দূরপাল্লার কোন একটা ট্রেন ঢুকছে । জোনাকিকে সে বেমক্কা বলেই বসল , চলো
ওটাতে উঠি গিয়ে ।
জোনাকি এবার তার দিকে চোখ কুঁচকে চাইল তারপর উল্টোদিকের ট্রেনটা দেখল ।
শীতের নিঝুম গাড়ি । অশোকের এবার মনে হল এই ট্রেনটায় তারা চাপলেই ট্রেনটা ঘোর একটা
কুয়াশার মধ্যে গিয়ে থামবে । তারপর যে কোন একটা নদীর তীরে । নদীর পাড় আর জল যেখানে
একাকার হয়ে আছে । কয়লা ধোয়া জল থাকলেও
থাকতে পারে নদীতে । শুধু জলটায় নোংরা তেল ভাসবেনা । ট্রেনের চাকায় জল লেগে জানলা
দিয়ে ছিটকে আসবে চোখে মুখে , তারপর একবার খুব জোরে হর্ণ বাজাবে ট্রেনটা টানেলের
ঢোকার মুখে । তারপর বিলকুল
হারিয়ে যাবে তারা ঐ ট্রেন শুদ্ধ ।
তীব্রতম [কষ্ট , না] ছাই
[পাথর] খুঁড়ে [কয়লা] অঙ্গার
তোমার [আঙুল ধরে] পাহাড়
[পোঁছানোর] কথা। অতল।
আমি [পুরুষ] কি ?
[? জাগে] ন[পুং] শক।
জোনাকি বলল - আমাদের যদি
এইরকম একটা নিজস্ব ট্রেন থাকে , তাহলে ?
আরো আধঘন্টা খানেক পর তারা তাদের নির্দিষ্ট ট্রেনে উঠে পড়ল এবং পাশাপাশি না
বসে দুজনে দুটো জানলার ধারে মুখোমুখি বসল । অশোক সরাসরি তাকাল জোনাকির চোখের দিকে
কিন্তু জোনাকি যেন ইচ্ছে করেই বাইরে তাকিয়ে আছে বুঝতে পারল সে । মজা করতে ইচ্ছে
করল অশোকের । এই মেয়েটি দীর্ঘ চারমাস যাবৎ অশোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব চালিয়ে যাচ্ছে ।
অশোক কি এবার একবার রং মশালটা নিজে হাতে ধরবে না ? সে জোনাকির দিকে তাকিয়েই রইল
এবং খুব আস্তে করে বলল , তোমার প্রেমিককে এখন ডেকে নিলেও মন্দ হত না ! ’ ভালই
প্রতিক্রিয়া হল তাতে । জানলা থেকে মুখ ঘুরিয়ে জোনাকি সামান্য ঝুঁকে অশোকের ডান
হাতের মধ্যমার ওপরে নিজের একটা নখ জোরে বসিয়ে দিল । স্বভাবজাত বোকাটে হাসিটা মুখের
ওপর তবু ধরেই রাখল অশোক । তার
বেশ লাগছে । নখের চাপ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে জোনাকি , তবু । কি আশ্চর্য ,
আসবার সময় যেটা একেবারেই শুনতে পায় নি অশোক , ট্রেনের হুইশল বাজছে খুব জোরে ।
ট্রেনটা গতি তুলেছে , পার হচ্ছে আসানসোল রেল ইয়ার্ড । নোখের চাপ হাল্কা করে দিয়ে
জোনাকি বলল - মনে থাকে যেন ।

Comments
Post a Comment