২। মৃতের মুখোমুখি......।।  

                              
ডাইনিং রুমের জানালা দিয়ে রোদ ঠিকরে পড়ছে । তার ঠিক পাশে বারান্দা । সেখান থেকে সোজা উত্তর পূর্বে চাইলে ডিপিএলের ধোঁয়া ওঠা চিমনি দেখা যায় ।
জোনাকি শুনেছে ঐ চিমনিটা দুশো দশ মিটার লম্বা । বারান্দায় দরজার পাশে চেয়ারে বসে দিনের বিভিন্ন সময়ে চিমনি দেখা জোনাকির নেশার মত । সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্য্যন্ত কত রকম রূপ পালটে পালটে যায় । সরু কাঁচের চুড়ির মত বৃষ্টির ফালি যখন চিমনির ওপরে উড়ে যায় , যেতে যেতে সাদা ধোঁয়াগুলোকে একপশলা ভিজিয়ে দেয় ।     
কখনও ধোঁয়ার ওপর দিয়ে উড়ে যায় কোন জেট প্লেন । তবু উদ্ধত থাকে চিমনি আর তার গর্বিত ধোঁয়া । আর রাত্তিরে  আলো ঝলমল দেখলে মনে হয় রোজ দীপাবলী । ধোঁয়াগুলোও যে কত রকমের , একএকদিন গোলাপি রঙের ধোঁয়াও দেখেছে জোনাকি । নীল সাদা লাল বা কালো ধোঁয়াগুলো শুধু দিনের আলোয় আকাশ ঢেকে ফেলার চেষ্টা করে । কিন্তু বেশিক্ষণ দম রাখতে পারে না । একটু ওপরে উঠেই কেমন উদাসীন হয়ে যায় । জোনাকি প্রত্যেক দিন একবার নতুন করে অবাক হয় । অবাক হওয়া ফুরোয় না । সুর্যাস্তের আগে একদল চামচিকে ব্যস্ত হয়ে ওড়ে । দল বেঁধে টিয়ার ঝাঁক বক উড়ে যায় চিমনির ওপর দিয়েজোনাকি তন্ময় হয়ে বসে শুধু চিমনি দেখে ।
এমনি উদাস উদাস হয়ে সে তাকিয়ে ছিল চিমনিটার দিকে। নিঝুম দুপুর। কুড়ি বছর অতীত থেকে কে যেন তাকে প্রশ্ন করল – তোমার কি হয়েছে সোনামা ?
চমকে উঠে জোনাকি টেনেটুনে পাতলা নাইটিটা ঠিক করে নেয় । সাদা ওড়না দিয়ে ঢেকে নেয় গা। কিন্তু চোখ খুলতে পারে না শব্দটা এত পরিষ্কার শুনল যে মনে হল ওর সমস্ত নার্ভগুলোও কেঁপে উঠছে । হালকা ভয় লাগল । দুপুরের এই সময়টাতে আজও সে বড় একা । সব দরজা জানালাতে পর্দা টাঙানো আছে শুধু চিমনির দিকের পর্দাটা অল্প ফাঁকা । সেখান দিয়েই অল্প একটু আলো চুঁইয়ে আসছে । পর্দার আশেপাশে ঘরের কোণে অন্ধকার ঘুপচি মেরে আছে । মিনিটের পর মিনিট চলে যায় জোনাকি শান্ত হয়ে বসে থাকে । তার বুকের ওঠাপড়া ছাড়া আর কোন জীবনের চিহ্ণ নেই । ঘরের পর্দাগুলো যেমন ঝুলছিল তেমনি মৃতের মত ঝুলে আছে জোনাকি দেখে তার দেখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে । শুধু নিজের বুকের ওঠানামা । হঠাৎ পর্দাটা দুলে উঠল মনে হল । কেমন হাওয়া আর আলোর মৃদু তারতম্য । মনে হল পর্দার পেছন থেকে একটা হাত বেরিয়ে এসে পর্দাটাকে মৃদু টেনে ধরেছে । শুধু আঙুলগুলো দৃশ্যমান । সেখানে বয়স আর অভিজ্ঞতার অজস্র ছাপ । কেমন যেন সত্তরের দশকে ঝান্ডা ধরার অস্পষ্ট দাগ দেখা যাচ্ছে । একটু চেনা কি ? ঐ হাতটাই কী সারারাত বাড়ি ফিরত না ? মাঝরাতে একবার এসে কিছু খেয়েই আবার কোথায় চলে যেত ?
ঐ হাত ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই । কোন শ্রবণযোগ্য শব্দ বা অন্য কিছু । বাইরে একজন ফেরিওয়ালা একটা কিছু ডেকে চলে গেছে অনেক আগেজোনাকির দিনে দুপুরেই বেশ ভয় করলতবু চোখ খোলে । খুলতেই দোদুল্যমান পর্দার ফাঁক দিয়ে সেই একঘেয়ে এবং অবাক করা চিমনি ও তার ধোঁয়ার ছবি উড়ে চলেছে দেখা যায় বাড়িটা বাইরে থেকে তালা বন্ধ । হয়ত তার মনের ভুল, এইরকম ধরে নিয়ে সে আবার চোখ বন্ধ করে । বন্ধের মুহুর্তে আবারো সেই আঙুলগুলো ভেসে উঠল । অজস্র ছাপ এবং দাগ, চেনা চেনা লাগে কি ? বাবা ! সত্যি বাবা ? বাবা, তোমার আঙুলগুলো এত কুঁচকে গেছে ?
সে খুব পরিষ্কার শুনতে পায় - এখানে খুব ঠান্ডা রে ! ঠান্ডায় শক্ত হয়ে শুয়েছিলাম অনেকদিন ।
- তাই অত দাগ ? কাটাকাটি, অন্ধকারের ছায়া জ্যামিতি ?
- হ্যাঁ রে ! আঙুলগুলো সাদা হয়ে গেলে দাগ থেকে গেছে । আজও একবার করে সুর্যাস্ত হলে একটা করে দাগ বেড়ে যায় কোনোটা পোষ্টার লেখার দাগ, কোনোটা পোষ্টার লাগানোর দাগ, কোনোটা মিছিল ঝান্ডা উঁচিয়ে, আর এই দাগটা কিসের জানিস ? তোর জন্মের পর তোকে যখন আদর করেছিলাম । তোর তখন একমাথা চুল ।
 - বাবা তোমার গলাটা না ঠিক দেবদুতের মত শোনাচ্ছে
- আমি সেটা বুঝতে পারছি না । সেটা কেমন ?
- কেমন যেন হালকা দুঃখ মেশানো , করুনা মায়া আর আনন্দ, কেমন যেন অনেক দূরের মন্দিরের ঘন্টা ধ্বনির মত । সেই যে ছোট বেলায় রাজগীর গিয়েছিলাম । পাহাড়চূড়োয় মন্দির থেকে ভেসে আসা নিজের গলার প্রতিধ্বনি শুনেছিলাম , তেমনি । কোথায় কবে কোন একটা প্রান্তরে কলিঙ্গ যুদ্ধ হয়েছিল , সেখানকার হাওয়া বয়ে নিয়ে আসছে তোমার গলা ।
- আমার গলার মধ্যে তুই এখনও যুদ্ধের শব্দই শুনতে পাস ?
- পাইই তো ! তবে যুদ্ধের হতাশাও শোনা যায়
- ঠিকই বলেছিস । যুদ্ধের হতাশা ! যুদ্ধের মধ্যে তো খুব সূক্ষ্ম ভাবে প্রতিহিংসা আর প্রয়োজন মিশে থাকে । সেই আলো আঁধারিতে যখন আমাদের হাতে রক্ত লাগে তখন তাকে জয় বলে মনে হয় না । কেমন বোধহীন ! মন হয় এত ক্ষত্রং  ক্ষত্রং , এর মানে কী? এমনও হয়েছে যে চারপাশে সবাই ঘিরে ফেলেছে আর আমরা যার জন্য ধনুক বাণ ধরেছি সেই মারা গেছে । তার পর জয় করে যখন ফিরে যাচ্ছি তখন আমার বুকে বন্ধুর রক্তের দাগ
- তোমার খুব কষ্ট না বাবা ?
- কষ্ট ? হবে বোধহয় ! প্রকৃত কষ্টটা ঠিক কি জানিস তো ? ঠিক যে মুহুর্তে অস্ত্র ছাড়লাম তখুনি ধৃষ্টধুম্নদের দল ঘিরে ধরল , আর যার জন্য ধনুকবান ধরেছি সেই মরে গেছে।
- বাবা যুদ্ধ তো কত হয়েছে , কুরুক্ষেত্রে লঙ্কায় কলিঙ্গে হিরোশিমায় , কিন্তু তোমাদের যুদ্ধ আমি এখনও বুঝতে পারি না । তুমি কখনো যুদ্ধে , কখনো আমাদের সাথে । তুমি আমাদের ভালবাসতে বাবা ? মাকে আমাকে ভাইকে ?
- প্রকৃত বিপ্লবীদের মধ্যে একটা বিশাল ভালোবাসার অনুভূতি থাকে কথাটা কে বলেছে জানিস ? চে গুয়েভেরা ।
- তোমাদের সেই ভালোবাসা ছিল ? ভালোবাসা তো মানুষের আত্মাকে মুক্তি দেয়  ।
- মুক্তি ? আমরা তো সারাজীবনই কারো না কারো কেবল দাসত্ব করে গেলামনেতা বিপ্লবী আদর্শ এইসব । স্বাধীনতা খুঁজেই পাইনি । স্বাধীনতার পরের সুখের শূণ্যতা । সেটাই তো মুক্তি । এখনও খুঁজছি সেটাই , তাই আজও আমার হাতে নতুন আঁচড়ের দাগ ।
- মৃত্যু কেমন বাবা ?
- এখনও আমি সেটা বুঝতে পারিনি । স্বধীনতার এক প্রান্ত বিন্দু মৃত্যু । আমরা সেটা খুঁজিনি , কেবল শত্রু খুঁজেছি ।
- তুমি কি শত্রুকে শেষ করেছ ?
- না রে । শত্রু নয় , কাউকেই নয় । শেষ হয়েছি আমি , আমরা । শেষ পর্য্যন্ত কে যে শত্রু, আর কে নয় বোঝা যায় না ।
- বাবা আমার মনে আছে , ছোটবেলায় আমরা কেমন সবাই জ্যোৎস্না দেখতে যেতাম ।
অনেক ছোটবেলার গল্প সেটা তখনও ভাই জন্মায় নি । তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছে তার বাবা । চেঁচিয়ে মাকে বলল - চিত্রা আজ আমরা জ্যোৎস্না দেখতে যাব  । তার মা খুশী হলেও বলে এই বয়সে এত ঢং ! এখন তোমার লেনিনের বই পড়া নেই ?
সারা বাড়ি জুড়ে লাল লাল মলাটের বই আর কোন রঙ নেই । এখনও জোনাকি শিউরে ওঠে লাল রঙ দেখলে । এত লাল কেন তাদের বাড়িতে ? লেনিন চে মাও ।
বাবা বলল - তাড়াতাড়ি খেতে দাও । লাল ময়দানে আজ জ্যোৎস্না আসবে দেদার ।
সন্ধ্যের পর ঐ মাঠ ফাঁকা হয়ে যায় । চারপাশের সমস্ত বাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে । আজ রাতে লাল ময়দান স্বপ্নের মত সাদা হবে । বাবা তাকে বলেছিল , তুমি তাড়াতাড়ি তোমার সাদা পরীর পোষাকটা পরে নিও । আজ আকাশে বরফ কুচি তারা ঝরবে আর আমরা সবাই জ্যোৎস্না মাখব ।
তার মা সেদিন আকাশী নীল শাড়িটা পরে । মাঠের মাঝে তারা যখন পৌঁছায় তখন প্রায় মাঝরাত । আকাশে জ্যোৎস্নাকুচি উড়ছে । তার মা একটা শতরঞ্চি নিয়ে এসেছে । সে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল শুয়ে শুয়ে বাবার হাতের আঙুলগুলোর নড়াচড়া দেখছিল । কেমন এক মায়াবী নৈঃশব্দ । কোন কথা নেই । এরপর দেখল তার মা হঠাৎ মাঠময় কেমন ছুটে বেড়াচ্ছে  । মায়ের পেছনে বাবাও । তাদের সম্মিলিত হাসি জ্যোৎস্নায় গলেগলে পড়ছিল । আনন্দের আতিশয্যে সে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল
জোনাকি জিজ্ঞেস করল - বাবা মৃত্যু কি ? কবিতা ? যখানে আমাদের সবাইকে যেতে হবে ?
- এই অনুভবে তুমি যেতে পার । তোমাকে ধরে নিতে হবে তুমি মৃত । কামনা বাসনা রহিত । নিজেকে নিস্পৃহ করতে হবে । আবার দখলও করতে হবে । নিস্পৃহ হও আর ত্যাগ করো । নিস্পৃহ হও আর যুদ্ধ করো । দাঁড়িয়ে থাক দরজার ওপারে । দেখ, দেখতে থাক , তুমি মৃত ।
- সেইসব জ্যোৎস্না রাতের পর তমাকে কত খুঁজেছি । পাইনি । মাও কেমন যেন হয়ে গেল তারপর । কেমন একা । সেটা কি মায়ের স্বাধীনতা ?
- মেয়েরা স্বাধীনতা চায় না । মেয়েরা ভালবাসার কাছে আত্মসমর্পন করে পূর্ণ হয় । জীবনের প্রত্যেকটা শূণ্যস্থান পূরণ করে ভালবাসা দিয়ে । ওরা শূণ্যতাকে ঘৃণা করে ।
- জান বাবা , সেদিন রাত্রে মা তোমার পরা ঘামে ভেজা গেঞ্জীটা রেখে দিয়েছিল , ওটা এখনও তেমনিই আছে । শুধু ঘামের গন্ধটা আর নেই । ফিকে হয়ে গেছে , পাই না ।
- দেখ আজ এতদিন পরেও তুই আমার শূণ্যতাকে ভরে রেখেছিস আমার একটা গেঞ্জী দিয়ে ।
- তুমি পরবে বাবা গেঞ্জীটা আর একবার ?
- সময় আমার আইডেনটিটি কেড়ে নিতে পারে নি । কিন্তু আমাকে কেড়ে নিয়েছে । আমিতো সময়ের এই খাঁজটার মধ্যে আবার ঢুকতে পারিনা । আমি এখন অনেকদূর
- আমার খুব একা লাগে বাবা । মাঝে মাঝে মনে হয় মরে যাই ।
- তুমি এখনও ভালবাসা খোঁজো , তাই ।
- ভালোবাসা একঘেয়েমিতে ভরে গেছে । পৌনপৌনিকতা
- কিন্তু চেনা সম্পর্কের বাইরে তো একাধিক ভালবাসা ছড়িয়ে আছে ।
- বাবা , চারিদিকের স্বার্থপরতা দেখে দেখে আমার আর কোনকিছুতেই ভালবাসা আসে না অথচ ভালবাসার আকাঙ্খা প্রবল ।
- মানুষের আচরণ এখন একটা জটিল জিলিপি । সেখানে আপাত উদারতাও একটা লুকোন স্বার্থপরতা । রোজ রোজ সাধার মানুষ হতে হতে ভালবাসাটাও সাধার হয়ে যায় । আকাঙ্খা মৃত্যু সবই সাধারকিন্তু তুমি তো আমার সাধারণ মেয়ে নও , তুমি এমনি করে ভাবছ কেন ?
জোনাকি ভাবে । চেয়ারের হাতলে তার দুটো হাত দুপাশে এলিয়ে পড়ে থাকে । হঠাৎই একটা খসখস শব্দে সে চমকে ওঠে । দেখে সামনে তার বর চন্দন দাঁড়িয়ে  । চমকে উঠে সে বলে - তুমি এখানে কি করছ ? তালা কখন খুললে ?
-      জ্যান্ত মানুষ দেখে কেউ এত ভয় পায় এই প্রথম দেখছি , এই বলে সে তার ঘেমো টি শার্টটা জোনাকির কোলের ওপর ছুঁড়ে দেয়  - এটা কেচে দিও তো !

জোনাকি কোন কথা বলে না । নিজেকে সামলে নেবার জন্য চুপ করে থাকে রোদ তখন ফিকে হয়ে এসেছে ।

Comments

Popular posts from this blog